সোনারগাঁও উপজেলার ঐতিহাসিক অলিপুরা রাবারড্যাম আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।  একসময় স্থানীয় কৃষকের সেচনির্ভর জীবনের প্রাণ এই রাবারড্যাম এখন অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে স্থাপিত এই রাবারড্যামটি এলাকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে টেকসই করার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বালু সন্ত্রাসীদের অবৈধ ড্রেজার মেশিনের কার্যক্রমে প্রকল্পটির মূল কাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাতে ড্রেজারের গর্জন, দিনে কৃষকের কান্না রাত্রির নীরবতা ভেঙে বালু উত্তোলনের শব্দ এখন নিত্যসঙ্গী অলিপুরা এলাকায়। নদীর বুক চিরে তোলা হচ্ছে বালু, আর তার প্রভাবে ড্যামের পাড় ধসে পড়ছে একের পর এক। আশপাশের ফসলি জমিতে দেখা দিচ্ছে ফাটল, পানি সরে যাচ্ছে নিচে, নষ্ট হচ্ছে ফসল।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল মান্নান (৫২) বলেন, “এই রাবারড্যামই ছিল আমাদের জীবনের আশ্রয়। এখানকার পানি দিয়েই চাষ করতাম, সংসার চালাতাম। এখন জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে— অথচ কেউ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”

আইন লঙ্ঘন করে চলছে বালু উত্তোলন 

পরিবেশবিদদের মতে, এই কর্মকাণ্ড ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)’ এবং ‘নদী ও বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১০’–এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।

গত ১০ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাবারড্যামের কাছেই চলছে কয়েকটি ড্রেজার মেশিন। স্থানীয়দের অভিযোগ— প্রশাসন জানলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আশপাশের জমি ইতিমধ্যে ধসে পড়েছে, কিছু এলাকায় পানি সরে গিয়ে ফসলি জমি অনুর্বর হয়ে পড়েছে।

“রাবারড্যাম রক্ষা মানেই কৃষি রক্ষা” — মীযানুর রহমান

পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির মহাসচিব মীযানুর রহমান বলেন,“অলিপুরা রাবারড্যাম শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি এলাকার পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে বালু উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, ফসলি জমি ধ্বংস হচ্ছে। প্রশাসনের এখনই হস্তক্ষেপ করা জরুরি— নইলে সোনারগাঁওয়ের কৃষি ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় নেমে আসবে।”

তিনি আরও বলেন,“আমরা পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির পক্ষ থেকে জোর দাবি জানাচ্ছি— অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে ড্যামটি পুনরুদ্ধার করা হোক। রাবারড্যাম রক্ষা মানে কৃষক রক্ষা, মাটি রক্ষা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা।”

কৃষির ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা অলিপুরা রাবারড্যাম একসময় ছিল সোনারগাঁওয়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির প্রতীক। এখানকার মানুষ এই ড্যামের পানি দিয়ে চাষাবাদ করত, মাছ ধরত, পরিবার চালাত। এখন সেই জলাশয় পরিণত হয়েছে ধুলার স্তূপে।

স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ড্যামটি পুরোপুরি ধসে পড়বে। আর তা হলে সোনারগাঁওয়ের কৃষি উৎপাদনে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

.

উৎস: Narayanganj Times

কীওয়ার্ড: ন র য়ণগঞ জ র ব রড য ম ব যবস থ পর ব শ অল প র স ন রগ

এছাড়াও পড়ুন:

তুরস্কের যে কৌশলে ‘জিহাদি’ শারা হয়ে উঠলেন সিরিয়ার ‘আমির’

২০১৯ সালের বসন্ত। রুশ বিমানবাহিনীর সহায়তায় সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ইদলিবের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। তৈরি হয় জরুরি পরিস্থিতি।

হায়াত তাহরির আল–শামের (এইচটিএস) নেতা আবু মোহাম্মদ আল–জোলানি (আহমেদ আল–শারা নামে বেশি পরিচিত) তখন ইদলিবের কেন্দ্রস্থলে একটি নিরাপদ বাড়িতে তাঁর সহযোগী ও কয়েকজন বিদেশি অতিথির সঙ্গে বসেছিলেন। অতিথিদের মধ্যে তুর্কিও ছিল।

রাত বেড়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে আল–শারা মন খুলে নিজের ব্যক্তিগত কিছু গল্প বলতে শুরু করলেন। ‘আমি ছোটবেলায় একবার স্বপ্ন দেখেছিলাম’, ধীরে, গভীর মনোযোগ নিয়ে বলতে থাকেন তিনি। ‘স্বপ্নে দেখেছিলাম, আমি দামেস্কের আমির হয়েছি।’

আশ–শারা বলেছিলেন, সেই স্বপ্ন ছিল শুভ ইঙ্গিত, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্রষ্টার একধরনের বার্তা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা কঠিন হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জেতা সম্ভব। তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা, যাঁদের মধ্যে সালাফি পটভূমির লোকও ছিলেন। বলেছিলেন, সেই স্বপ্ন সত্যি তিনি বিশ্বাস করতেন।

ওই গল্প বলার প্রায় পাঁচ বছর পর আহমেদ আল–শারা তাঁর বিদ্রোহী খেতাব কাটিয়ে সিরিয়ান আরব রিপাবলিকের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ সেই ‘আমির’ হন, যার স্বপ্ন তিনি একসময় দেখেছিলেন।

রাত বেড়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে আল-শারা মন খুলে নিজের ব্যক্তিগত কিছু গল্প বলতে শুরু করলেন। ‘আমি ছোটবেলায় একবার স্বপ্ন দেখেছিলাম’, ধীরে, গভীর মনোযোগ নিয়ে বলতে থাকেন তিনি। ‘স্বপ্নে দেখেছিলাম, আমি দামেস্কের আমির হয়েছি।’

এখন জোলানি নিজের জন্মনাম আহমেদ আল–শারা নামে পরিচিত। ৪৩ বছরের শারা খুব দ্রুতই নিজের পরিচয় পাল্টে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। একসময়ের ‘জিহাদি সন্ত্রাসী’ (যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কথায়) থেকে এখন রাষ্ট্রনেতা তিনি। ইরাক থেকে সিরিয়া। দীর্ঘ সময় আল–কায়েদা ঘরানার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে সক্রিয় থাকার পর এমন পরিবর্তন বিস্ময়করই বলা যায়।

আসাদ পরিবারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর শারা এখন সেসব বিশ্বনেতার সঙ্গেও মিশছেন, যাঁদের তিনি একসময় এড়িয়ে চলতেন। তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে জনসমক্ষে উপস্থিত হন, শ্মশ্রু ছোট করেছেন, পাগড়ি ও থোব (ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘ ঢিলেঢালা পোশাক) ছেড়ে স্যুট–টাই পরছেন। সব মিলিয়ে এমন একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করছেন, যেখানে স্পষ্ট ইসলামি প্রভাব নেই।

কিন্তু এ রূপান্তর কীভাবে সম্ভব হলো

তুরস্কসহ আঞ্চলিক কর্মকর্তারা, সিরীয় সূত্র, বিশেষজ্ঞ, এমনকি সিরিয়ার সরকারি শাসনব্যবস্থার ভেতরের লোকেরাও মনে করেন, ইদলিবে শারার শাসনামলেই ধীরে ধীরে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও ভূমিকার এ পাল্টে যাওয়া শুরু হয়। ইদলিব মূলত একধরনের অনানুষ্ঠানিক ‘ক্ষুদ্র রাষ্ট্র’ হয়ে উঠেছিল, যা শারার ভাবমূর্তিকে পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

‘তাঁর (আল–শারা) রূপান্তরে তুরস্ক খুবই বাস্তব ভূমিকা রেখেছে’, এইচটিএসের নেতা থাকাকালীন শারার সঙ্গে দেখা করা একজন তুর্কি কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন।

তুরস্কের সঙ্গে প্রথম বড় যোগাযোগ

তুর্কি কর্মকর্তার মতে, শারার নিজেরও বদলে যাওয়ার কারণ ছিল। সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকতে হতো, আর তুরস্কই ছিল তাঁর একমাত্র ভরসা। কারণ, তিনি এমন এক এলাকায় আটকে ছিলেন, যেখানে আঙ্কারা ছিল তাঁর জীবনসঞ্চারণী রেখার মতো।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৪ মে ২০২৫

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • ক্যারিয়ারের শুরুতে কত টাকা পারিশ্রমিক পেতেন তৌকীর?
  • ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিন্দুধর্মের প্রতি আনুগত্য আর গোপন নেই, কেমন এমন সমালোচনা হচ্ছে
  • একাত্তরের পর আবারও যেভাবে বিপর্যয়ের মুখে পাকিস্তান
  • তুরস্কের যে কৌশলে ‘জিহাদি’ শারা হয়ে উঠলেন সিরিয়ার ‘আমির’