মাছ থেকে শুরু করে মশা, নানা বিষয়ে গবেষণা হয় যেখানে
Published: 6th, July 2025 GMT
চিংড়িচাষিদের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস। এ ভাইরাস আক্রমণ করলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারা পড়ে চিংড়ি। ভাইরাসটি কেন আক্রমণ করে, ব্যাপকতা কতটুকু, কোন ধরনের টিকা এ ভাইরাস রোধ করতে পারে—তা নিয়ে গবেষণা করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একটি দল।
প্রথম ধাপের ওই গবেষণা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ইনফরমেশন (এনসিবিআই) ও আমেরিকান সোসাইটি অব মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। এ গবেষণার মাধ্যমে মূলত হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাসের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্সিং) উন্মোচন করেন গবেষকেরা।
গবেষক দলে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের স্নাতকের শিক্ষার্থী রুবেল আহমেদ ও শেখ মোহাম্মদ তাহমিদ। কক্সবাজার, টেকনাফ, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা ঘুরে ঘুরে তাঁরা গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করেন। তারপর এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং, রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব (এনরিচ) বা গবেষণাগারে।
রুবেল ও তাহমিদ জানান, বাংলাদেশে বিরাজমান হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাসের প্রকরণ কেমন, চিংড়ির মৃত্যুর ক্ষেত্রে ভাইরাসের কোন বিষাক্ত প্রোটিন বা জিন ভূমিকা রাখে, এটি কীভাবে ছড়ায়—এসব তথ্য জানার উদ্দেশ্যেই কাজ করছেন তাঁরা। এ ছাড়া দেশে প্রথমবারের মতো ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। এ গবেষণার তথ্য ভাইরাসটি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে। এখন তাঁরা প্রতিষেধক তৈরির কাজ করছেন।
আরও পড়ুনকেন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছিলাম২০ অক্টোবর ২০২৪শুধু এই দুই তরুণ গবেষক নন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এনরিচ’ গবেষণাগার রাত-দিন এক করে কাজ করছেন একদল তরুণ। তাঁরা কখনো ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার ক্ষেত্রে জিনগত ভিন্নতা বের করেছেন, আবার কখনো ডেঙ্গুর নতুন ধরন নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এসব গবেষণা।
শুরুর গল্প২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের এ গবেষণাগার। এখানে আছে ‘আইসেক-১০০’, জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয় এই যন্ত্র। বায়োইনফরমেটিকস–সংক্রান্ত কাজের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারও আছে। এ গবেষণাগার থেকে এ পর্যন্ত ৪৫টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে ১৭টি প্রকল্পের কাজ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপের গবেষক দলের তত্ত্বাবধানে গবেষণাগারটি পরিচালিত হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও এ গবেষণাগার ব্যবহার করেন। যেমন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষকেরা নানা বিষয়ে এখানে কাজ করেছেন। নেচার পোর্টফোলিও, ল্যানসেট–এর মতো বিশ্বখ্যাত সাময়িকীতে জায়গা পেয়েছে তাঁদের প্রবন্ধ।
এ গবেষণাগারে মোটাদাগে তিনটি ক্ষেত্রে কাজ হয়—সংক্রামক রোগ, জিনগত ও বংশগত রোগ, খাদ্যনিরাপত্তা ও সমুদ্রবিজ্ঞানে জীবপ্রযুক্তির প্রয়োগ।
গবেষণাগার সম্পর্কে ল্যাবের অন্যতম প্রধান ও জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, ‘দেশের যেকোনো প্রান্তের তরুণ গবেষকেরা এখানে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাঁদের হাতেখড়ি হচ্ছে গবেষণায়। কখনো তাঁরা করোনার নতুন ধরনের ভয়াবহতা নিয়ে কাজ করছেন। আবার কখনো নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী ক্লেবসিয়েলা ব্যাকটেরিয়ার গতিপ্রকৃতি জানার চেষ্টা করছেন।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরাও এনরিচে কাজ করার সুযোগ পান.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ক জ করছ ন প রক শ ক জ কর
এছাড়াও পড়ুন:
গুগলে কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাখ্যা
গুগলকে কনটেন্ট সরাতে অনুরোধের সংখ্যা বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাখ্যা দিয়েছে।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ফেসবুক পেজে দীর্ঘ এক পোস্টে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আরো পড়ুন:
সংঘর্ষের পর প্রক্টর বদলসহ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় জোর যবিপ্রবির
নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির নেতৃত্বে নাহিদ ও নাসিফ
পোস্টে বলা হয়েছে, সরকার বাংলাদেশের নাগরিকদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন-কেন্দ্রিক চরিত্রহননের বাইরে দেশের কোনো পত্রিকার নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত পোস্ট, ভিডিও কনটেন্ট, রিলস, অনলাইনে প্রকাশিত আর্টিকেল, অভ্যন্তরীণ কোনো সমালোচকের রাজনৈতিক সমালোচনামূলক কোনো কনটেন্ট সরাতে সরকার কোনো প্ল্যাটফর্মকে অনুরোধ করেনি।
উল্লেখ্য, মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন-কেন্দ্রিক বেআইনি মানহানিকর তথ্য দিয়ে কারো চরিত্রহননের চেষ্টাসংক্রান্ত তথ্য অপসারণের অনুরোধ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসমূহ এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মাধ্যমে বিটিআরসিতে যায়।
বর্তমান সরকার সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের সিআরআই বা এ জাতীয় কোনো বট বাহিনী পরিচালনা করে না। বিটিআরসি বা এনটিএমসিসহ বাংলাদেশের কোনো এজেন্সি বা সংস্থা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্ট ডাউন করার ক্ষমতা রাখে না, সে জন্য যেকোনো অনুরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ও টেক প্ল্যাটফর্মকে জানাতে হয়।
জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়ে গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট অ্যানালিসিস করে দেখা যায়, ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৭৯টি অনুরোধ যায়। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের জুন-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালে পাঠানো ছয় মাসের মোট সংখ্যা ৮৬৭ এর তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।
তার আগের ছয় মাসে অর্থাৎ থেকে জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৪, এই ৬ মাসে বাংলাদেশ রিকোয়েস্ট করেছে মাত্র ১৫৩টি, যা আওয়ামী আমলের সর্বোচ্চ অনুরোধ সংখ্যার সাড়ে পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং আওয়ামী আমলের সর্বনিম্ন রিকোয়েস্ট জুন-ডিসেম্বর ২০২৩ সময়ের ৫৯১টির অর্ধেকেরও কম। অর্থাৎ স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার এত কমসংখ্যক রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে, যা উল্লেখযোগ্য নয়।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট মতে, ৬৫ শতাংশ অনুরোধ হচ্ছে ‘Not enough information’ ক্যাটাগরিতে। অর্থাৎ এসব বিষয় বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ ছিল না। সোর্স-https://transparencyreport.google.com/.../government.../BD
জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশ ভেতর ও বাহির থেকে এক অনাকাঙ্ক্ষিতহারে মিস-ইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের শিকার হয়। প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া থেকে ক্রমাগত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিস-ইনফরমেশন ও প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু হয়। সরকারকে এসবের বিরুদ্ধে বেশ কিছু রিপোর্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গুগলকে দিতে হয়েছে।
পাশাপাশি এ সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষিদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিটি) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষ খুনের বিচার শুরু হলে আওয়ামী লীগ সাইবার স্পেসে ক্রমাগত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিস-ইনফো ক্যাম্পেইনসহ সন্ত্রাসের আহ্বান শুরু করে।
দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখা, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, ধর্মীয়, জাতিগত এবং নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে অনলাইনে ও অফলাইনে সুরক্ষা দান সরকারের দৈনিক দায়িত্বের অংশ।
যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাইবার স্পেস দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম এলিমেন্ট হয়ে উঠেছে, তাই বিশ্বের সব দেশের মতোই বাংলাদেশ সরকারকে এখানে রেগুলেশনের নিমিত্তে কিছু রিপোর্ট করতে হয়। পাশাপাশি সরকার অনলাইন জুয়া এবং গ্যাম্বলিং সংক্রান্ত কিছু টেক-ডাউন রিকুয়েস্টও করেছে। যেহেতু গুগলের স্বচ্ছতা রিপোর্টে মিস-ইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং ক্যারেক্টার এসাসিনেশন বিষয়ক আলাদা কোনো ক্যাটাগরি নেই, এসব রিপোর্ট সরকারের সমালোচনা ক্যাটাগরিতে দেখানো হয়েছে। তথাপি এই সংখ্যা আওয়ামী সরকারের তুলনায় সংখ্যায় পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম।
অত্যন্ত হতাশার বিষয় এই যে, বাংলা ও ইংরেজিতে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশের পূর্বে সরকারের ব্যাখ্যা কিংবা বক্তব্য চাওয়া হয়নি। প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে এরকম চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশের হীনম্মন্য প্রবণতা, সমাজের স্থিতিশীলতাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যাহীন খণ্ডিত সংবাদ প্রকাশ, কোনোভাবেই দায়িত্বশীল মিডিয়ার ভূমিকা হতে পারে না।
উল্লেখযোগ্য যে, জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, শতাধিক বড় আন্দোলন হয়েছে, বেশকিছু মব হয়েছে, মাজার ভাঙাসহ সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনিতে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে কয়েকটি। বছরের শুরুতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল, যার সঙ্গে সরকারের একটি স্বাস্থ্য কার্ড বিতরণ কার্যক্রমও সম্পর্কিত ছিল।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিশোধের প্রবণতা দেখা গেছে।
সরকার অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে নাগরিকদের জানাতে চায় যে, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে প্রকাশিত সূচকে দেশের বাকস্বাধীনতা ও ইন্টারনেট সূচকের অসামান্য অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা ও ইন্টারনেট সূচকের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ফ্রিডম হাউসের Freedom on the Net 2025 রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এ বছর বাংলাদেশ ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একক দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির স্কোর গত বছরের ৪০ থেকে বেড়ে ৪৫ হয়েছে, যা সাত বছরে সর্বোচ্চ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফলে দমনমূলক সরকার অপসারিত হওয়ায় এবং অন্তর্বর্তী সরকার ইন্টারনেট বন্ধ প্রতিরোধে পদক্ষেপ এবং সাইবার সুরক্ষায় ইতিবাচক সংস্কার নেওয়ার ফলে এই উন্নতি হয়েছে।
ঢাকা/এসবি