চালকের আসনে সরকার, সিদ্ধান্তও তাদের দিতে হবে
Published: 10th, November 2025 GMT
অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারকাজে হাত দিয়েছিল, সেই সংস্কার বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা ছিল না। এটা আইনের সংস্কার, সার্বিকভাবে নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার। এই সংস্কারপ্রক্রিয়ায় অনেক আইনি বিষয়েও আগে থেকে অনেকের ধারণা ছিল না। সে কারণে আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
এই সরকারকে অনেকে জনগণের অভিপ্রায়ে গঠিত সরকার বলছে। অনেকে বলছে বিপ্লবের পরে পরিবর্তনের অভিপ্রায়ে গঠিত সরকার। সংবিধান রক্ষা করার অঙ্গীকার করে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সংবিধানের বৃত্তের মধ্যে থেকে অনেক পরিবর্তন করা যাচ্ছে না।
ঐকমত্য কমিশন গঠন ও পরবর্তী সময়ে সরকার ছিল অনুঘটকের ভূমিকায়। কিন্তু পরে দেখা গেল, সরকার হাত গুটিয়ে নিল। ঐকমত্য কমিশনে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলো। তবে অনেক প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দেওয়া হয়। যারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে তারা বলেছিল, সরকার গঠনের পরে তারা জনগণের কাছে যাবে এবং জনগণের রায় অনুযায়ী সেটি তারা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সরকার নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে দিল। এই নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হলো। ভিন্নমত তুলে দিয়ে সরকার রাজনীতি দলগুলোকে মুখোমুখি করে দিল।
আরও পড়ুনজুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জট খোলার চেষ্টায় সরকার ২ ঘণ্টা আগেজুলাই সনদের আইনগত ভিত্তি দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়ার রায় ঠিকই রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দিল। সরকার ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আট মাস ধরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। কিন্তু এখন বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দিবে। এটি সরকারের একধরনের বাতুলতা। এভাবে কোনো সমাধান হবে না। যে কারণে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
সরকার এটি কোনো অভিমান থেকে বলেছে কি না, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি করা হলো। এর আগে সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো দিয়েছে, তা সব দল মানেনি। এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি, গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটি যে সবাই মানবে, সেই ভরসা করা উচিত নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন কীভাবে করা যায়, সেটি সরকারকে চিন্তা করতে হবে।
আরও পড়ুনজুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে দ্রুত সব দলের অভিন্ন মত চায় সরকার ০৩ নভেম্বর ২০২৫দ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোকে ডেকে কথা বলতে হবে সরকারকে। এর মধ্য থেকে পথ বের করে আনতে হবে। নইলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, বিতর্ক বাড়বে। এখন সব দায়িত্ব সরকারের। সরকার এখন চালকের আসনে, অনুঘটকের আসনে নয়। নির্বাচন এবং ট্রানজিশনের এই সময়ে সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। দেশের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো আগেও ছাড় দিয়েছে, এখনো ছাড় দেবে বলে আশা করা যায়।
মাহমুদুর রহমান মান্না: সভাপতি, নাগরিক ঐক্য।
.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
জনগণ দায়িত্ব দিলে বিএনপি আবার দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত: তারেক রহমান
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দুর্নীতি লাখো মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে দম বন্ধ করে ফেলেছে। বহু বছর অব্যবস্থাপনার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই কঠিন হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসই প্রমাণ করে, যখন সৎ নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের সমর্থন একসঙ্গে আসে, তখন পরিবর্তন অসম্ভব নয়। জনগণ যদি দায়িত্ব দেয়, বিএনপি আবার সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন। তিনি তাঁর পোস্টে দুর্নীতির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিএনপি কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয় নিয়েও লেখেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘দুর্নীতি কীভাবে বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, তা বুঝতে দূরে যাওয়ার দরকার নেই। মেধার ভিত্তিতে চাকরি খুঁজতে বের হওয়া একজন গ্র্যাজুয়েটের সঙ্গে কথা বললেই বুঝবেন। মাসের পর মাস ধরে একটি সাধারণ সরকারি সেবা পেতে হিমশিম খাওয়া কৃষকের দিকে তাকান। হাসপাতালে গিয়ে এক তরুণের পরিবার কীভাবে ভোগান্তিতে পড়ে, সেটা শুনুন। অথবা ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখতে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া উদ্যোক্তাদের ভোগান্তি দেখুন।’
দুর্নীতি লাখো মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে দম বন্ধ করে ফেলেছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, খাবারের দাম কেন বাড়ে, স্কুলে ভালো পড়াশোনা কেন মেলে না, রাস্তায় কেন নিরাপত্তা নেই—সবকিছুর পেছনে সেই একই কারণ, দুর্নীতি।
বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই নতুন নয় বলে উল্লেখ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা বহু যুগের আলোচনার বিষয়। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস আমাদের সেই লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয় সেই সময়টাও, যখন বাংলাদেশ সত্যিকারের অগ্রগতি করেছিল। আর সেই সময়টা এসেছে মূলত বিএনপির আমলে।’
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো, পরিচ্ছন্ন সরকারি সেবা আর অর্থনীতিকে মুক্ত করার কাজে হাত দিয়েছিলেন, যা অনিয়ম-ক্ষমতার অপব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিল। তারপর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আধুনিকায়ন শুরু হয়। নতুন ক্রয় নীতিমালা, কঠোর আর্থিক আইন, শক্তিশালী অডিট ব্যবস্থা, আর স্বচ্ছ নজরদারি কার্যকর করা হয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল ২০০৪ সালে দুদক গঠন। এটি এমন এক স্বাধীন কমিশন, যেখানে সরকার চাইলে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বিশ্বব্যাংক, এডিবি—সবাই বলেছিল, এটি বাংলাদেশের জবাবদিহির বড় অগ্রগতি।
তারেক রহমান বলেন, টিআইবির জরিপেও দেখা গেছে, ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মানুষ নিজেরাই বলেছে, দুর্নীতি কমেছে। এটা কোনো গল্প নয়, এটা তখনকার সংস্কারের প্রমাণ।
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে বাজেট নিয়ন্ত্রণ, অডিট, ব্যাংকিং ও মানি লন্ডারিংবিরোধী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও নিয়মের মধ্যে সরকারি স্বচ্ছ ক্রয়নীতি চালু করে, যা পরবর্তী সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় স্বচ্ছতার আইনের ভিত্তি তৈরি করে। টেলিকম, মিডিয়া, বিমান পরিবহন খাতে উন্মুক্ত বাজার গড়ে তোলে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয়। ফলে দুর্নীতি কমে, সাধারণ মানুষের সুযোগ বাড়ে। এ ছাড়া প্রশাসনের জটিলতা কমিয়ে এবং জবাবদিহি বাড়ানোর মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশে এমন কিছু বড় পরিবর্তন ঘটেছে, যার জন্য তাঁর দল গর্ব করতে পারে। দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে ধারাবাহিক রেকর্ড একমাত্র বিএনপিরই আছে।
আগামী দিনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও শক্তভাবে চালাতে বিএনপির কিছু পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান। সেগুলো হলো—
১. প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা: আদালত, দুদক, নির্বাচন কমিশন, সরকারি সেবা; কেউই যেন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে না থাকে।
২. পুরোপুরি স্বচ্ছতা: উন্মুক্ত দরপত্র, সম্পদ বিবরণী, রিয়েল–টাইম অডিট ও শক্তিশালী তথ্য অধিকার আইন।
৩. বিচার ও আইনশৃঙ্খলা সংস্কার: পেশাদার পুলিশিং, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ।
৪. ই-গভর্ন্যান্স: লাইসেন্স, জমি, পেমেন্ট—সব অনলাইনে এনে ঘুষের সুযোগ কমানো (বিশ্বমান অনুযায়ী ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ দুর্নীতি কমতে পারে)।
৫. হুইসলব্লোয়ার সুরক্ষা: অনিয়ম ফাঁস করতে যারা সাহস দেখায়, তাদের নিরাপত্তা প্রদান।
৬. নৈতিক শিক্ষা: স্কুল-কলেজ থেকেই সততার চর্চা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা।
৭. শক্তিশালী আর্থিক নজরদারি: ডিজিটাল ব্যয় ট্র্যাকিং ও স্বাধীন অডিট এবং সংসদের কঠোর তদারকি।