সুদানের উত্তর দারফুর প্রদেশের রাজধানী এল-ফাশার এখন এক মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দখলে নেওয়ার পর শহরটিতে শুরু হয়েছে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্যমতে, শত শত নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, নারীরা হয়েছেন যৌন সহিংসতার শিকার, ঘরবাড়ি ও শরণার্থী ক্যাম্পে চলছে অগ্নিসংযোগ।

একসময় প্রাণচঞ্চল এই শহর এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি আশ্রয়কেন্দ্রও আরএসএফের হামলা থেকে রেহাই পায়নি। শুধু একটি হাসপাতালেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষ। খবর আলজাজিরা ও আনাদোলুর। 

সুদানে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস জানিয়েছে, আরএসএফ গত মাসে এল-ফাশার দখল করার পর থেকে ‘নৃশংস হামলা’ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত শনিবার (৮ নভেম্বর) সুদানে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিনিধি লি ফাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে বলেন, “এল-ফাশার শোকের শহরে পরিণত হয়েছে।” 

তিনি বলেন, “১৮ মাস ধরে অবরোধ ও যুদ্ধে বেঁচে থাকা বেসামরিক নাগরিকরা এখন অকল্পনীয় মাত্রার নৃশংসতা সহ্য করছে।”

এই সতর্কতা এমন সময় এলো যখন সাহায্যকারী গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে যে, এল-ফাশার থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষ তাওয়িলা শহরে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। অনেকেরই খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় সামগ্রী এবং মানসিক সহায়তার তীব্র প্রয়োজন।

রবিবার (৯ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানায়, এল-ফাশার শহর থেকে নতুন করে আরো ৭ হাজারেরও বেশি বেসামরিক মানুষ পালিয়েছে। যার ফলে গত মাসে আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ কর্তৃক শহরটি দখলের পর থেকে মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮৯ হাজারে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের সংস্থাটির তথ্যানুসারে, ৫ থেকে ৮ নভেম্বরের মধ্যে এল-ফাশার থেকে আরো ৭ হাজার ৭৫ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বাস্তুচ্যুতরা উত্তর দারফুরের তাওয়িলা, মেলিট এবং সারাফ ওমরা সহ একাধিক এলাকায় পালিয়ে গেছে।

আইওএম জানায়, ২৬ অক্টোবর আরএসএফ এল-ফাশার দখলের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮৮ হাজার ৮৯২ জন লোক শহর ছেড়ে পালিয়েছে। আরএসএফের দখলের আগে শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ছিল।

গত ২৮ অক্টোবর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক গবেষণাগারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এল-ফাশারে ‘গণহত্যার’ প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে স্যাটেলাইট ছবিতে দৃশ্যমান রক্তের স্রোতও রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক গত শুক্রবার বলেন, এখনও আটকে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের শহরটি থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমি আশঙ্কা করছি যে, শহরের মধ্যে হত্যযজ্ঞ, ধর্ষণ ও জাতিগতভাবে সহিংসতার মতো জঘন্য নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে।” 

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানের সেনাবাহিনী (এসএএফ) ও আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতা দখল নিয়ে সংঘাত শুরু হয়, যা পরিণত হয় পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে। জাতিসংঘ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ২০ হাজারেও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

দুর্ভোগের মাত্রা এতটাই বিস্তৃত যে জাতিসংঘ এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলের বেশ কয়েকটি মধ্যস্থতা সংঘাত শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর জ ত স ঘ র ম নব ধ ক র এল ফ শ র র শহর

এছাড়াও পড়ুন:

বসতি, বাজার ও স্কুলে বোমাবর্ষণ করে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে সুদানের বিমানবাহিনী

সুদানের বিমানবাহিনী দেশটির আবাসিক এলাকা, বাজার, স্কুল ও বাস্তুচ্যুতদের শিবির লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ চালিয়ে অন্তত ১ হাজার ৭০০ মানুষকে হত্যা করেছে। সেখানে গৃহযুদ্ধ চলাকালে বিমান হামলা নিয়ে এক তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে।

‘সুদান উইটনেস প্রজেক্ট’ বলেছে, সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া সাম্প্রতিকতম লড়াইয়ে সরকারি বাহিনী যেসব বড় বড় বিমান হামলা চালিয়েছে এবং তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সেসব তথ্য নিয়ে তথ্যভান্ডার প্রস্তুত করেছে তারা।

সুদান উইটনেসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিমানবাহিনী জনবহুল এলাকায় ‘আনগাইডেড’ বোমা বেশি ব্যবহার করেছে।

আনগাইডেড বোমা বলতে এমন বোমা বোঝানো হয়, যা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যে ছোড়া হয় না; বরং আকাশ থেকে ফেলার পর সেটি যেকোনো এলাকায় পড়তে পারে। এতে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়।

আরএসএফ আকাশ থেকে হামলা চালাতে ড্রোন ব্যবহার করেছে। কিন্তু এ গবেষণায় ড্রোন হামলায় হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সুদান উইটনেস প্রজেক্ট শুধু যুদ্ধবিমান থেকে বোমা হামলা চালানোর ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে তৈরি করেছে এ প্রতিবেদন। সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে যুদ্ধবিমান আছে। কিন্তু তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী, প্যারামিলিটারি র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) কাছে কোনো যুদ্ধবিমান নেই।

আরএসএফ আকাশ থেকে হামলা চালাতে ড্রোন ব্যবহার করেছে। কিন্তু এ গবেষণায় ড্রোন হামলায় হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সুদান উইটনেস হলো সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্সের (সিআইআর) পরিচালিত একটি উদ্যোগ, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো প্রকাশের কাজ করে। এ প্রকল্পের জন্য ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তহবিল পেয়েছে তারা।

বিবিসি ওই গবেষণা প্রতিবেদনের একটি আগাম অনুলিপি হাতে পেয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুদান উইটনেস ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত ৩৮৪টি বিমান হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে। এসব হামলায় ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত ও ১ হাজার ১২০ জন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহত উভয় সংখ্যাই আরও বেশি হতে পারে। কারণ, তারা সর্বনিম্ন সংখ্যা ধরে এ হিসাব করেছে।

‘সুদান উইটনেস প্রজেক্ট’ বলেছে, যেসব এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে, সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল ও বিশ্বাসযোগ্য সূত্র চিহ্নিত করা দুরুহ। এ ছাড়া সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সংখ্যার খবর সম্ভবত কম জানা গেছে।

সুদান উইটনেস যে ৩৮৪ ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে, তার মধ্যে ৩৫টি ঘটনায় বোমাবর্ষণ করা হয় বাজার বা বাণিজ্যিক স্থাপনায়। হামলার সময় ওই সব স্থানে মানুষের ভিড় ছিল। আর ১৯টি হামলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

সুদান উইটনেস স্বীকার করেছে, তাদের গবেষণা অসম্পূর্ণ। কারণ, তাদের ফলাফল মোট হামলার সংখ্যার ভিত্তিতে নয়; বরং তাদের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

প্রজেক্ট আরও বলেছে, যেসব এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে, সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল ও বিশ্বাসযোগ্য সূত্র চিহ্নিত করা দুরুহ। এ ছাড়া সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সংখ্যার খবর সম্ভবত কম জানা গেছে।

আরও পড়ুনসুদানের যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে কারা০৪ নভেম্বর ২০২৫আরও পড়ুনসুদানে কারা গণহত্যা চালাচ্ছে, আরব আমিরাতের ভূমিকা কী ৩১ অক্টোবর ২০২৫

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • বাংলাদেশে দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৫০ লাখ মানুষ: আইওএম
  • বিশ্বব্যাপী অর্ধেক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরায়েল দায়ী
  • বসতি, বাজার ও স্কুলে বোমাবর্ষণ করে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে সুদানের বিমানবাহিনী