ভারতীয় বাংলা সিনেমার দাপুটে অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। ব্যক্তিগত জীবনে ছোট পর্দার অভিনেত্রী অপরাজিতা ঘোষের সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন এই অভিনেতা। অবসর পেলেই স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন এই যুগল। বিলাসবহুল ভাবে সময় কাটানো নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে সময় কাটানোই এই দম্পতির মূল উদ্দেশ্য। 

ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ঋত্বিকের স্ত্রী অপরাজিতা ঘোষ। এ আলাপচারিতায় স্বামীর সঙ্গে তার রসায়ন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ‘চিরসখা’ ধারাবাহিকের ‘কমলিনী’। ধারাবাহিকের কমলিনীর মতোই বাস্তব জীবনেও সংসার আগলে রেখেছেন এই অভিনেত্রী। 

আরো পড়ুন:

‘সম্পর্ক দু’মিনিটে তৈরি হওয়া নুডলস নয়’

হাসপাতালে জিতু কমল

অপরাজিতা ঘোষ বলেন, “ঋত্বিকের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ফাউন্ডেশন বন্ধুত্বের। অনেক বছর আগে আমরা বন্ধু ছিলাম, মাঝে আমাদের বিয়ে হয়েছে ঠিকই, এখনো আমরা বন্ধু। আশা করি, আগামী দিনেও এই বন্ধুত্বের সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চেয়ে এগিয়ে থাকবে।”  

ব্যাখ্যা করে অপরাজিতা ঘোষ বলেন, “ব্যাপারটা খুব কঠিন তা কিন্তু নয়। এটা আমাদের সহজাত ধর্ম। ২৪ ঘণ্টা একটা মানুষের সঙ্গে থাকার পর আবার সেই মানুষটার সঙ্গেই আমার থাকতে ইচ্ছা করে। এই মানুষটার সঙ্গে আমি ভীষণ বুড়ো হতে চাই। কার কী হয় জানি না, তবে আমাদের এমনটাই লাগে।” 

স্বামী ঋত্বিকের সঙ্গে মনোমালিন্যর কথা স্বীকার করে অপরাজিতা ঘোষ বলেন, “অন্য যেকোনো দম্পতির মতো আমাদের মধ্যেও কথা কাটাকাটি হয়, মতবিরোধ হয়। এটা স্বাস্থ্যকর। যেকোনো সম্পর্কে মতবিরোধ হওয়াটা জরুরি। এটা ভীষণ স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তবে তার মানে এই নয় যে, আমরা একে অপরের মতকে সম্মান করি না। আমরা নিজেদের মতামত বলি এবং তারপর মাঝামাঝি একটা জায়গায় আসি। অনেক সময় এমনও হয় যে, আপনাদের একে অপরের মতই ঠিক বলে মনে হয়।” 

২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ঋত্বিক ঘোষ ও অপরাজিতা। এ দম্পতির উপমন্যু নামে একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। 

ঢাকা/শান্ত

.

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর চলচ চ ত র অপর জ ত আম দ র

এছাড়াও পড়ুন:

অশ্রুসিক্ত ক্যামেরায় সম্ভ্রমহারার ছবি

মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই ছবি অ্যারেঞ্জ করে তোলার প্রশ্নই আসে না। কারণ, বাস্তবে ভয়াবহতা ছিল আরও বেশি।আলোকচিত্রী নাইব উদ্দিন

এলোমেলো চুল আর মুষ্টিবদ্ধ হাতে আড়াল করছেন নিজের মুখ। ওড়নাটা আছে মাথার ওপর ছাতার মতো। জানালার ফাঁক গলে আলো এসে পড়ছে শরীরে। ১৯৭১ সালের মে মাসের কোনো একদিনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাদাকালো ফিল্মে মুখঢাকা মেয়েটির কয়েকটি ছবি তুলেছিলেন নাইব উদ্দিন আহমেদ। কয়েক মাস পর এই সিরিজের একটি ছবি ছাপা হয় বিশ্ববিখ্যাত দৈনিক দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে। এই ছবি ছাপা হওয়ার পর সারা দুনিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। বিশ্ববাসী জানতে পারে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অসহায় নারীদের সম্ভ্রম হারানোর কথা। ছবিটি প্রকাশের কারণে জীবনঝুঁকিতে পড়েন নাইব উদ্দিন। এ ছবির নেগেটিভ কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তিনি বলেননি সে কথা। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এ ছবি বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের প্রতীকী আলোকচিত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরও এখনো অনেকে বলাবলি করেন ছবিটি বানানো। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন, ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের পরে মডেল দিয়ে সাজিয়ে তোলা। অথচ এ ছবি নিয়ে জীবদ্দশাতেই বিস্তারিত বলে গেছেন নাইব উদ্দিন। ১৯৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রথম আলোর বুধবারের সাময়িকী নারীমঞ্চে ‘কীভাবে তোলা মুক্তিযুদ্ধের এই ছবি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। নাইব উদ্দিনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন প্রতিবেদক মেহেদী মাসুদ। নাইব উদ্দিনের কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ‘বহুল আলোচিত এই ছবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটা কথা শোনা যায়, অভিযোগও বলতে পারেন—ছবিটি নাকি অ্যারেঞ্জ করে তোলা। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?’ জবাবে নাইব উদ্দিন বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই ছবি অ্যারেঞ্জ করে তোলার প্রশ্নই আসে না। কারণ, বাস্তবে ভয়াবহতা ছিল আরও বেশি।’ মেহেদী মাসুদ মেয়েটির নাম জানতে চান। নাইব উদ্দিন নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। বললেন, ‘ধরে নিন না কোনো একটা নাম।’ তবে ছবিটি কেমন করে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে তুলেছেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।

এই ছবি ছাপা হওয়ার পর সারা দুনিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। বিশ্ববাসী জানতে পারে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অসহায় নারীদের সম্ভ্রম হারানোর কথা। ছবিটি প্রকাশের কারণে জীবনঝুঁকিতে পড়েন নাইব উদ্দিন।

নাইব উদ্দিন তখন ময়মনসিংহে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রধান আলোকচিত্রী। একাত্তরের ২৬ মার্চ এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘স্বাধীন বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে ঘোষণা করলেন উপাচার্য ড. কাজী ফজলুর রহীম। মুহূর্তে এ খবর পৌঁছে যায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। ২৬ এপ্রিল দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য আসে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে তারা আঞ্চলিক কমান্ড হেড কোয়ার্টার ঘোষণা করে। তাদের সঙ্গে ভিড়ে যায় স্থানীয় বিহারিরা। ময়মনসিংহ শহরে তখন তিন লাখ বিহারির বসবাস ছিল। শহরে তাদের বড় কলোনিও ছিল। বিহারিদের সহযোগিতায় দখলদার বাহিনী শহরজুড়ে হত্যা, লুট, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে থাকে। তাদের তাণ্ডবে প্রাণের ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মচারীরা পালিয়ে যান। ক্লাস বন্ধ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ চালিয়ে রাখার জন্য তারা বিহারিদের মাধ্যমে আশপাশের গ্রামে আশ্রয় নেওয়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের কথায় অনেকেই কাজে এসে যোগ দেন। তাঁদের বেশির ভাগ বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তানিরা তাঁদের ভাই, ওরা মুসলমানের কোনো ক্ষতি করবে না। এ রকম বিশ্বাসে তাঁরা নিয়মিত অফিস করতেন, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাতেন।

নাইব উদ্দিনের সঙ্গে একটি মেয়ের প্রায় রাস্তায় দেখা হয়। মেয়েটি একটু চঞ্চল স্বভাবের। বাবার সহকর্মী বলে স্নিগ্ধ মেয়েটি নাইব উদ্দিনকে ‘চাচা’ বলে ডাকতেন। একদিন সালাম দিতেই নাইব উদ্দিন মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সারা ক্যাম্পাসে এত এত সৈন্য ঘোরাফেরা করে, ওদের মধ্য দিয়ে কলেজে যেতে তোমার ভয় করে না?’ মেয়েটি বললেন, ‘ক্লাস হয় না, তবু বাবা জোর করে পাঠায়।’ আরেক দিন দেখা হতেই মেয়েটি বললেন, ‘চাচা, ব্রহ্মপুত্রের চরে সাদা কাশ ফুলে ভরে গেছে। সেখানে আমার একটা ছবি তুলে দেবেন?’ নাইব উদ্দিন বললেন, ‘অবশ্যই।’ মেয়েটি হাসতে হাসতে বললেন, ‘চাচা, সেদিন কিন্তু আমিও আপনাকে একটা গান শোনাব।’ ‘বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ—আমরা/ গেঁথেছি শেফালি-মালা’ গানের কলিটি গুনগুন করে গাইতে গাইতে মেয়েটি চলে গেল।

কয়েক দিন পরের ঘটনা। মেয়েটিকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর হানাদারদের এক দোসর জানাল, পাকিস্তানি সৈন্যরা মেয়েটিকে ধরে নিয়ে গেছে। তার সহযোগিতায় ক্যাপ্টেন আনজুমের বাংকার থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করা হলো। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ভর্তি করা হলো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শুনে নাইব উদ্দিনের মনটা ভার হয়ে গেল। তিনি মেয়েটিকে দেখতে হাসপাতালে গেলেন। বেডের সঙ্গে মেয়েটির হাত-পা বাঁধা। মাঝে মাঝে উন্মাদিনীর মতো ছটফটিয়ে ওঠে। মেয়েটির মা পাশেই দাঁড়ানো। তাঁর চোখে পানি। মেয়েটিকে দেখে নাইব উদ্দিনের কান্না পেয়ে যায়। হু হু করে কাঁদতে চান, কিন্তু পারেন না। ব্যথায় বুকটা ভার হয়ে আসে।

মেয়েটির মা বললেন, ‘ওর তো সবই গেছে, কিছুই আর বাকি নাই, কিন্তু ওর ছবি ছাপা হলে যদি অন্য মেয়েদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হয়; তাহলে তা–ই করুন।’ ক্যামেরা তাক করতেই মেয়েটি দুই হাত আর চুল দিয়ে তাঁর মুখ ঢেকে ফেলেন।মুখঢাকা মেয়েটি [ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মে ১৯৭১]। আলোকচিত্র: নাইব উদ্দিন আহমেদ

সম্পর্কিত নিবন্ধ