উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী আদালত স্থাপনে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। গতকাল সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দশম দিনের সংলাপে তারা এ ব্যাপারে একমত হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি অবস্থা জারির পদ্ধতি বদলাতে সংবিধান সংশোধন এবং জরুরি অবস্থার রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধেও ঐকমত্য হয়েছে।  
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার পর উপজেলা সদরে স্থায়ী আদালত গঠন করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে তা বাতিল করে তৎকালীন সরকার। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন অধস্তন আদালত বিকেন্দ্রীকরণে উপজেলা আদালত ব্যবস্থা পুনর্বহালের সুপারিশ করেছে। 

প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ দশম দিনের সংলাপ শেষে বলেছেন, নাগরিকের সুবিচারের অধিকার নিশ্চিতে উপজেলা সদরে অধস্তন আদালত স্থাপনে সব রাজনৈতিক দল একমত। তবে ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় এ আদালতের প্রয়োজন নেই। জেলা জজ আদালতেই থাকবে সদর উপজেলা আদালত। যেসব উপজেলা জেলা সদরের কাছাকাছি, সেখানেও আদালত স্থাপনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে দলগুলো। চরাঞ্চল, দ্বীপ, দুর্গম এবং দূরবর্তী যেসব এলাকায় চৌকি আদালত বিদ্যমান, সেগুলোতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী আদালত স্থাপনে একমত দলগুলো। অন্যান্য উপজেলায় জনঘনত্ব, যাতায়াত সুবিধা, অর্থনৈতিক অবস্থা ও মামলার সংখ্যা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আদালত স্থাপনের মত এসেছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থ বরাদ্দ করতে হবে এবং আইনগত সহায়তা উপজেলা পর্যায়ে নিতে হবে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, চৌকি আদালত রয়েছে ৬৭ উপজেলায়। এগুলোকে স্থায়ী করার পক্ষে মত দিয়েছে বিএনপি। যেসব উপজেলা জেলা সদর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটারের মধ্যে, সেখানেও আদালত স্থাপনের প্রয়োজন নেই। তবে সদর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে এবং জনসংখ্যা বেশি, এমন উপজেলায় আদালত করা যায়।

বিএনপি সরকারের বাতিল করা উপজেলা আদালত পুনঃস্থাপনে দলটি কেন একমত হচ্ছে– এ প্রশ্নে সালাহউদ্দিন বলেন, ১৯৯১ সালে রাজনৈতিক সেন্টিমেন্ট উপজেলা আদালতের পক্ষে ছিল না। ৩৫ বছরে প্রেক্ষাপট বদলেছে। দেশ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজনে ও জনগণের স্বার্থে আগের বিবেচনা তো পালটাতেই হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড.

হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, উপজেলা আদালতের মূল চেতনাই হচ্ছে বিচারপ্রার্থীর কষ্ট দূর করা। ন্যায়বিচার, বিচারপ্রার্থীকে দুর্ভোগ থেকে মুক্তি, বিচার সহজীকরণ ও মামলার চাপ কমাতে জামায়াত উপজেলা আদালতের সুপারিশকে সমর্থন করছে। 
এদিকে উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণে বিভাগীয় সদরে হাই কোর্টের বেঞ্চ স্থাপনে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করে প্রধান বিচারপতিকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, গুটি কয়েক বিচারপতি এবং আইনজীবীর স্বার্থের কাছে বিচারিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া আটকে থাকতে পারে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যে যে সিদ্ধান্ত হবে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্যে সংস্কারের ম্যান্ডেট রয়েছে। 

জরুরি অবস্থার অপব্যবহার বন্ধে ঐকমত্য
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও নাগরিকের মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যাবে না। শুধু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে নয়; জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) সুপারিশে জরুরি অবস্থা জারি করবেন রাষ্ট্রপতি। বিএনপির আপত্তিতে এনসিসি গঠনের প্রস্তাব আগেই প্রত্যাহার করেছে কমিশন। 
গতকালের আলোচনার পর আলী রীয়াজ বলেন, জরুরি অবস্থার অপব্যবহার বন্ধে ঐকমত্য হয়েছে। 
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯৭৪ এবং ২০০৭ সালে জারি হওয়া জরুরি অবস্থায় বিরোধী মতকে দমন করা হয়েছে। তাই জরুরি অবস্থা জারির পদ্ধতি সংশোধনে ঐকমত্য হয়েছে। আগামী সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। 

তবে এনসিপির আখতার হোসেন বলেন, সংস্কার সংসদের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। এই সরকারেরই সংস্কারের ম্যান্ডেট রয়েছে। জুলাই সনদকে নিছক ডকুমেন্ট, দলিল হিসেবে উপস্থাপন করার যে চিন্তা অনেকের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, এর বিপক্ষে এনসিপির অবস্থান। মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। জরুরি অবস্থায় যেন মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করা হয়। এ বিষয়ে এখনও ঐকমত্য হয়নি। জরুরি অবস্থার সময় কারও বিচারপ্রাপ্তির অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। 
জামায়াতের হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, যুদ্ধ, বহিরাক্রমণের সময়ে জরুরি অবস্থা জারির বিধান রাখতে একমত জামায়াত। 
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন। ঘোষণার বৈধতার জন্য ঘোষণার আগেই মন্ত্রিসভার লিখিত অনুমোদন নিতে হবে। জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও বেশ কিছু মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন বা স্থগিত করা যাবে না।

গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক বলেন, অনেক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শুধু শিরোনামে একমত হচ্ছে। সারবস্তুতে একমত হচ্ছে না। ফলে সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। 
সংলাপের শুরুতে আলী রীয়াজ বলেন, কমিশন রাজনৈতিক দলের ওপর সংস্কার চাপিয়ে দিচ্ছে না। সব দল সব বিষয়ে শতভাগ একমত হবে না। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সঞ্চালনায় সংলাপে এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য সফর রাজ হোসেন, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং ড. আইয়ুব মিয়া।

 

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: উপজ ল য় অবস থ র ব এনপ

এছাড়াও পড়ুন:

রাষ্ট্র সংস্কার কি সরকারের কাছে শুধুই ফাঁকা বুলি, প্রশ্ন টিআইবির

‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন করায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) জবাবদিহির বাইরে রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার কেবলই ফাঁকা বুলি কি না, এ প্রশ্নও তুলেছে টিআইবি।

আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত দুদকের উত্তরণের লক্ষ‍্যে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ করা হয়েছিল। এই সুপারিশ বাদ দেওয়া শুধু হতাশাজনক নয়, সরকারের অভ্যন্তরে প্রায় সব ক্ষেত্রে সংস্কারবিরোধী মহলের ষড়যন্ত্রের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারের অভীষ্টের জিম্মিদশারও পরিচায়ক।

জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতির পরও চূড়ান্ত অধ্যাদেশে এই সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের অনাগ্রহের ইঙ্গিত বলে মনে করে টিআইবি।

দুদককে প্রকৃত অর্থে একটি জবাবদিহিমূলক, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এই কৌশলগত সুপারিশটি অনুধাবনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বলে উল্লেখ করে টিআইবি আরও বলেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের জন্য এটি স্ববিরোধী ও সংস্কারপরিপন্থী নজির।

ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ও ১১টি সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা দুদককে জবাবদিহির বাইরে রাখার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলসহ দেশবাসীকে কি এই বার্তা দিতে চাইছেন যে রাষ্ট্র সংস্কার কেবলই ফাঁকা বুলি—এ প্রশ্নও বিবৃতিতে তুলেছে টিআইবি।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতা, অংশীজনদের মতামত, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় দুদক যাতে ক্ষমতাসীনদের হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে চলমান না থাকে, সে লক্ষ‍্যে দুদক সংস্কার কমিশন ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। জন্মলগ্ন থেকে দুদক যেভাবে জন–আস্থার সংকটে ভুগছে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রীড়নক হিসেবে ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা আর প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রস্তাবটি করা হয়েছিল।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে অন্তত সাতজন উপদেষ্টা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাঁরা জানেন যে এই প্রস্তাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। জুলাই সনদ লঙ্ঘনের এরূপ উদাহরণ সৃষ্টি করার আগে সরকার কেন ভাবছে না যে এর মাধ‍্যমে রাজনৈতিক দলকে তারা নিজেরাই জুলাই সনদ লঙ্ঘনে উৎসাহিত করছে? তাহলে কেন এত রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ? দুর্নীতির কার্যকর নিয়ন্ত্রণের উপায় রুদ্ধ করে কীসের রাষ্ট্র সংস্কার?’

অধ‍্যাদেশটির যে খসড়াটি টিআইবির দেখার সুযোগ হয়েছিল, তা অনেকাংশে বিদ্যমান আইনের তুলনায় উন্নত মানের হওয়ায় টিআইবি সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যানুযায়ী, চূড়ান্ত অধ্যাদেশে উল্লিখিত বিষয়টির পাশাপাশি আরও কিছু ঐকমত্য-অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের অভ্যন্তরে স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী মহলের দুর্নীতি-সহায়ক ও সংস্কার-পরিপন্থী অবস্থান ছাড়া আর কিছু হতে পারে না বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • রাষ্ট্র সংস্কার কি সরকারের কাছে শুধুই ফাঁকা বুলি, প্রশ্ন টিআইবির
  • ইজমা: ইসলামি আইনের অন্যতম ‘দলিল’