ঢাকায় গির্জায় হাতবোমা হামলার অভিযোগে ‘ছাত্রলীগ সদস্য’ গ্রেপ্তার
Published: 10th, November 2025 GMT
ঢাকায় খ্রিষ্টান উপাসনালয়ে হাতবোমা হামলার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২৮ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর রমনার সেন্ট মেরি’স ক্যাথেড্রাল এবং মোহাম্মদপুরের সেন্ট যোসেফ স্কুল প্রাঙ্গণে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তিন দিন পর আজ সোমবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে কাকরাইলের সেন্ট মেরি’স ক্যাথেড্রাল এবং সেন্ট যোসেফ স্কুল প্রাঙ্গণে ককটেল বিস্ফোরণসহ একাধিক ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ডিএমপি এই জঘন্য ও কাপুরুষোচিত সহিংসতায় জড়িত প্রত্যেককে গ্রেপ্তারের জন্য র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সঙ্গে সমন্বয় করে শহরজুড়ে অভিযান জোরদার করেছে। রাজধানীর সব গির্জা ও সব ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
আন্তধর্মীয় ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধর্মীয় সহাবস্থানে কোনোরূপ বিঘ্ন ঘটানোর প্রচেষ্টা হলে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে।
গত শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে রমনা এলাকার সেন্ট মেরি’স ক্যাথেড্রালে দুটি ককটেল বা হতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। এর মধ্যে একটি বিস্ফোরণ হলেও আরেকটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। হামলার পরদিন শনিবার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণে সেন্ট মেরি’স প্রাঙ্গণে জুবিলি উদ্যাপন অনুষ্ঠান ছিল। ওই রাতেই মোহাম্মদপুরের সেন্ট যোসেফ স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণে আরও একটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তার আগে গত মাসে তেজগাঁও হলি রোজারিও চার্চে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।
এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে গত শনিবার বিবৃতি দেয় বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ)। সংগঠনটির সভাপতি নির্মল রোজারিও ও মহাসচিব হেমন্ত আই কোড়াইয়ার বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গির্জায় ককটেল নিক্ষেপের ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর সরাসরি আঘাত।’
আরও পড়ুনঢাকায় চার্চে হাতবোমা হামলার নিন্দায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ২১ ঘণ্টা আগে.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ চলছেই, আগুন দেখা যাচ্ছে হোটেল থেকেই
পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন সাংবাদিক পিটার আর কান ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ছিলেন। ওই সময় প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রে লেখা পাঠানোর সুযোগ না পেয়ে দিনপঞ্জি রাখতে শুরু করেন তিনি। কয়েক দিনের দিনপঞ্জি একসঙ্গে পাঠালে তা প্রকাশ করত ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ওয়াল স্টিট জার্নাল তাঁর দিনপঞ্জি প্রকাশ করে। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য আজ তাঁর ১২ ডিসেম্বরের দিনপঞ্জি তুলে ধরা হলো।
পুরো দিনের জন্য কারফিউ কার্যকর হয়েছে। শহর পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে, যেন এক মহামারিতে হুট করেই শুধু চারদিকে উড়ে বেড়ানো কালো কাকগুলো বাদে সব জীবন্ত প্রাণী উবে গেছে। অবশ্যই, এই শহরের একমাত্র মহামারি এখন ভয়।
মাথার ওপর সি১৩০ চক্কর দেওয়ার শব্দে আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। মনে হলো নারী ও শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ বিমান সত্যি সত্যিই এসে গেছে। যদি বিমানগুলো ঢাকা ত্যাগ করতে পারে, তবে এই ডায়েরিও হয়তো তাদের সঙ্গে চলে যাবে।
হলিক্রস কলেজের ফাদার টিম ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এসে পৌঁছান ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে, মূলত সবাইকে বিদায় সম্ভাষণ জানানোই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু সদ্যই খবর এল যে বিশেষ ফ্লাইট ঢাকায় পৌঁছে যাওয়ার পথে রয়েছে। বিদেশিরা বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ফাদার বললেন, ‘এখন আমি বুঝতে পারছি যে নববধূ একা বেদিতে দাঁড়িয়ে থাকলে কেমন বোধ হয়।’ বিশেষ বিমানে যাওয়ার জন্য যেসব বয়স্ক আমেরিকান দম্পতি তালিকাভুক্ত ছিলেন, তাঁরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে বেরিয়ে গেলেন।
এক পুরুষের মাথায় ছিল অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হ্যাট, নারীর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছিল একটি খাঁচা, যাতে ছিল দুটি ময়না পাখি। তিনি বললেন, ‘আমাকে আমার কুকুর ছেড়ে যেতেই হচ্ছে। এটি ভয়ানক।’
বিমানবন্দরে ব্রিটিশ কূটনীতিকেরা ও অন্য স্বেচ্ছাসেবীরা গাছের ডাল দিয়ে রানওয়ে ঝাড়ু দিচ্ছিলেন, এভাবেই সরানো হচ্ছিল শার্পনেল। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর সি১৩০ উড়োজাহাজ অবতরণের চেষ্টা চালায় বেশ কয়েকবার; অবশেষে ঝুঁকি নিয়ে বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়েতে অবতরণ করে। কমলা রঙের ধুলোর মধ্যেই নিরাপদ অবতরণ হয়। যেতে চাওয়া ব্যক্তিরা জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠেন এবং হাততালি দিলেন। প্রপেলার ঘুরছিল, তবু তার মধ্যেই গমনেচ্ছু ব্যক্তিরা বিমানের দিকে দৌড়ে গেলেন এবং ওঠা শুরু করলেন। সবকিছু বেশ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই হলো। প্রথম বিমানে নারী ও শিশুরা উঠল এবং এভাবেই চলতে থাকল।
আরও পড়ুনরাও ফরমান আলী পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়ে গোপন সমঝোতা করছেন১১ ডিসেম্বর ২০২৫ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসের লোকেরা বিমানে বড় বড় স্যুটকেস তোলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নির্দেশনা হলো, ‘শুধু ১০ কেজি নেওয়া যাবে।’ এটি সত্যিই বিস্ময়কর যে মানুষ কীভাবে তাদের জিনিসপত্রের মায়ায় জড়িয়ে যায়; এমনকি শেষ বিমানের শেষ যাত্রীটিও স্যুটকেস নিয়ে ব্যস্ত ছিল, যেখানে কিনা অতিরিক্ত ৩০ সেকেন্ড সময়ের অর্থ হলো আপনার বিমান ছেড়ে চলে যেতে পারে! কারও কারও চোখ ছিল অশ্রুভেজা এবং কেউ কেউ আবেগমথিত হয়ে পড়েছিল।
দেখা গেল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক মেজর তাঁর স্ত্রীকে বিমানে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমেরিকান এক কর্মকর্তাকে অনুরোধ করলেন। উত্তর ছিল ‘না’ এবং পাকিস্তানি ওই সেনা কর্মকর্তা ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে গেলেন। সোভিয়েত কনসাল জেনারেল ছিলেন উৎফুল্ল চিত্তে। তিনি বললেন, ‘আমি খুশি যে আমার সঙ্গী বিমানে উঠে গেছে।’
বিমানবন্দরে প্রতীকী অবস্থান ছিল পাকিস্তানিদের, ভাঙা কাচ ও অন্যান্য ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একজন অভিবাসন কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের পাসপোর্টে সিল দেওয়ার জন্য। কিন্তু এটি বিশেষভাবে ব্রিটিশদের একক কর্মকাণ্ড। এক ব্রিটিশ সহকর্মীকে আরেক জার্মান টেলিভিশন প্রতিবেদক বললেন, ‘এখন আমি বুঝতে পারছি, কেন তোমরা ব্রিটেনের যুদ্ধে জিতেছিলে।’ চারটি সি১৩০ বিমান অবশেষে চার ঘণ্টা সময়ে যাত্রী ও মালামাল নিয়ে উড্ডয়ন করল, যেসব বিদেশি যেতে চেয়েছিল, তাদের প্রায় সবাইকেই নিয়ে গেল বিমানগুলো।
বিমানগুলো চলে যাওয়ায় হোটেলটি আশ্চর্যজনকভাবে অনেকটাই শান্ত হয়ে এল। বাকি বিদেশিরা, যাঁদের বেশির ভাগই সাংবাদিক—তাঁরা বিকেলটা কাটালেন সুইমিংপুলের পাশে। তাঁরা ওয়াটার পোলো ও সকার খেললেন এবং কাকের দিকে ময়লা ছুড়ে সময় কাটালেন।
আরও পড়ুনবিমানবিধ্বংসী কামান থেকে বের হচ্ছিল সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী০৯ ডিসেম্বর ২০২৫বিবিসি রেডিওর সংবাদে প্রতি ঘণ্টায় পাওয়া যাচ্ছিল নিত্যনতুন খবর। ভারতীয়রা ঢাকার কাছাকাছি চলে আসছে, নদী অতিক্রম করছে, ধারণা করা হচ্ছে প্যারাস্যুট ইউনিটও নামিয়েছে। কিন্তু ঢাকা আছে কারফিউর মধ্যে এবং কেউ যুদ্ধের খোঁজে যেতে পারছে না। কেউ একজন পুলের পাশে বসে বই পড়ছিল, ‘সিক্স ডেজ ইন জুন: ইসরায়েলস ফাইট ফর সারভাইভাল’। গত ১০ দিন টিকে রয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, তবে বাজি হচ্ছে—আরও দুই সপ্তাহ টিকতে পারবে না। শহরের আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ চলছেই এবং আগুন দেখা যাচ্ছে হোটেল থেকেই।
* ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির একাংশ আবার প্রকাশ করা হলো।
আরও পড়ুনজেনারেল নিয়াজিকে বলা হয়েছে, অস্ত্র নিয়ে হোটেলে ঢুকতে পারবেন না১০ ডিসেম্বর ২০২৫