বাড়ন্ত শহরে কোণঠাসা শৈশব-কৈশোর
Published: 10th, November 2025 GMT
শহরের একটি শান্ত সকাল। এমন সকালে প্রশস্ত, ছায়াঢাকা ফুটপাত ধরে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে দুই ভাইবোন। তারা হাঁটছে হাত–ধরাধরি করে। এমন একটা দৃশ্যের কথা ভাবুন তো। কী সুন্দর ছবি! প্রতিটি পরিবারে কিছু সুখের ছবি থাকে। ঠিক তেমনই এই ছবিও একটি নগরের সুখের ছবি।
শহরের এমন একটি ছবি তৈরি করতে অনেক নগরচিন্তক, নগরকারিগর ও প্রতিষ্ঠানকে চিন্তাশীল অবদান রাখতে হয়। শহরের দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনার চর্চা, সে অনুযায়ী অবকাঠামোর উন্নয়ন, নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এমন দৃশ্য তৈরি হয়। আর আমার কাছে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মানুষ এবং তার জন্য গণপরিসর সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করা।
গণপরিসর ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো নগরে শিশু–কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। খেলার মাঠ, উদ্যান, জলাশয়, নদী, নির্মল বাতাস, সবুজ বনানী, নিরাপদ ফুটপাত—একটি নগরের গণপরিসর ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অংশ। এসবই নগরের প্রাণ।
সফল শহরের সার্থকতা নির্ভর করে এর গণপরিসর কতটা উন্মুক্ত, কতটা সুন্দর করে ব্যবহার করা হয় এবং শহর কর্তৃপক্ষ কতটা সুন্দরভাবে তা গুছিয়ে রাখতে পারে, তার ওপর। নগরজীবনে গণপরিসরকে এমনভাবে বিন্যাস করা উচিত, যাতে মানুষে মানুষে অর্থপূর্ণভাবে দেখা করা, কথা বলা এবং সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
আমাদের দেশের নগরগুলোয় সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন এবং সুশাসনের অভাবে শিশু–কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা যায়নি। দেশের গণপরিসর উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের ধরন খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখানে নগরের প্রায় সব পরিসরেই ক্ষমতাবান, সক্ষম ও সামর্থ্যবান ব্যক্তির অভিপ্রায় প্রাধান্য পেয়েছে।
নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের উপযোগী শহর এ দেশে তৈরি হয়নি। এখানে মালিকানাবিহীন যৌথ পরিসর ব্যবহারের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক দর্শন সংকুচিত হয়েছে। এ কারণে আমাদের শহরাঞ্চলে নগরজীবন কখনো আরামদায়ক হয়ে গড়ে ওঠেনি। নগরে বসবাসকারী মানুষের চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল আচরণ না দেখালে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর কোনো দিন নিশ্চিত করা যাবে না।
নগর–পরিকল্পনার ভাষায় আমরা বলি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ১৫ মিনিট হাঁটা দূরত্বে যেন একটি খেলার মাঠ অথবা পার্কের মতো একটি গণপরিসর পেয়ে যান।স্বাস্থ্য অবকাঠামো
গণপরিসরের উপাদানগুলো সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এই উপাদানকে আমরা স্বাস্থ্য অবকাঠামো বলি। এর মধ্যে উদ্যান বা পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ যেমন আছে, তেমনি আছে নদী, লেকসহ বিভিন্ন জলাশয়, সবুজ বনানী ও রাস্তাঘাট।
রাস্তা ও এর দুই পাশের ফুটপাত নগরজীবনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও গুরুত্বপূর্ণ গণপরিসর। এ ছাড়া স্টেডিয়াম, ব্যায়ামাগার, কমিউনিটি স্পেস, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, কমিউনিটি লাইব্রেরি, নদীর তীর, খোলা প্রান্তরকে গণপরিসরের অংশ হিসেবে ধরা হয়।
নিরাপদ ও প্রশস্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান শিশু–কিশোরদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তেমনই নারী ও বয়স্ক মানুষসহ সবার জন্য পার্ক বা উদ্যান প্রয়োজন।
আমাদের ছোটবেলায় মাঠ ছাড়া একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কল্পনা করা যেত না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া, মহল্লা বা ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ থাকা দরকার। নগরে খোলা আকাশের নিচে দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকা দরকার। খেলাধুলা, বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, স্কাউটিং ইত্যাদি সহশিক্ষা কার্যক্রম স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
শহরে পর্যাপ্ত সবুজ পরিবেশ ও জলাশয়ের ব্যবস্থা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটায়। লাইব্রেরি, শিশু–কিশোর ক্লাব, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আর্ট ও ক্র্যাফট কর্মশালা, সিনেমা, থিয়েটার ইত্যাদি বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শিশু–কিশোরদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
রাজধানীর লক্ষ্মীবাজারের এই ছবি প্রথম আলোয় ছাপা হয় ২০২২ সালে। পরে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের সামনে থেকে শিশুদের খেলাধুলার স্থাপনা সরানো হয়েছে.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: স ব স থ য অবক ঠ ম ব যবস থ র জন য ব যবহ শহর র নগর র
এছাড়াও পড়ুন:
পেছনে ফিরে দেখেন ছেলে নেই, গর্তের ভেতর থেকে ডাকছে ‘মা, মা’ বলে
রাজশাহীর তানোরে ৩০-৩৫ ফুট গভীর গর্তে পড়ে যাওয়া শিশুটিকে উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। খননযন্ত্র দিয়ে মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে অক্সিজেন সরবরাহও অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বুধবার বেলা একটার দিকে তানোরে সাজিদ নামের দুই বছর বয়সী শিশুটি গভীর গর্তে পড়ে যায়। শিশুটি তার মায়ের হাত ধরে কেটে নেওয়া ধানের খেতে হাটছিল। হঠাৎ সে গর্তে পড়ে যায়। সাজিদ উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের রাকিবের ছেলে। রাকিব ঢাকায় একটি জুট মিলের ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরি করেন। তিনি এখনো বাড়িতে পৌঁছাতে পারেননি।
আরও পড়ুনরাজশাহীতে দুই বছরের শিশু ৩০ ফুট গভীর গর্তে, ফায়ার সার্ভিস অক্সিজেন দিচ্ছে২ ঘণ্টা আগেশিশুটির মা রুনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, বেলা একটার দিকে মেজ ছেলে সাজিদের হাত ধরে তিনি বাড়ির পাশে মাঠে যাচ্ছিলেন। এ সময় তাঁর ছোট একটি সন্তান কোলে ছিল। হাঁটার সময় হঠাৎ সাজিদ মা বলে ডেকে ওঠে। তিনি পেছনে তাকিয়ে দেখেন, ছেলে নেই, গর্তের ভেতর থেকে ‘মা, মা’ বলে ডাকছে। গর্তটির ওপরে খড় বিছানো ছিল। ওখানে যে গর্ত ছিল, সেটা তিনিও বুঝতে পারেননি, ছেলেও। ওই জায়গায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে গর্তের ভেতর পড়ে গেছে। লোকজনকে ডাকতে ডাকতেই ছেলে গর্তের নিচে চলে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের রাজশাহী বিভাগের সহকারী পরিচালক দিদারুল আলম জানান, শিশুটি গর্তে পড়ে যাওয়ার খবর তাঁরা পেয়েছেন বেলা আড়াইটার দিকে। এসে দেখেন, স্থানীয় লোকজন চেষ্টা করতে গিয়ে গর্তের ভেতরে কিছু মাটি ফেলেছেন। বিকেল চারটা পর্যন্ত শিশুটির সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। পরে মানুষের হট্টগোলের কারণে আর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
উদ্ধারপ্রক্রিয়া নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ওই কর্মকর্তা বলেন, ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় ও নিরাপদে উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা চলছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে ওই গর্তের পাশে এক্সকাভেটর দিয়ে আরেকটি গর্ত খোঁড়া হচ্ছে। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত খোঁড়া হয়েছে। মাটি সরানোর কাজে লাগানো হয়েছে দুটি ট্রাক্টর। খননকাজ শেষ হতে আরও কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে।
স্থানীয় লোকজন জানান, রাজশাহীর তানোর উপজেলার পচন্দর ইউনিয়নের এই গ্রামে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এ এলাকায় এখন গভীর নলকূপ বসানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে। এ অবস্থার মধ্যে কোয়েলহাট গ্রামের এক ব্যক্তি তাঁর জমিতে পানির স্তর পাওয়া যায় কি না, সেটা যাচাই করার জন্য গর্তটি খনন করেছিলেন। সেই গর্ত ভরাটও করেছিলেন, কিন্তু বর্ষায় মাটি বসে গিয়ে নতুন করে গর্ত হয়। সেই গর্তেই শিশুটি পড়ে যায়।
উদ্ধারকাজ দেখার জন্য এলাকার শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। রাত সোয়া আটটার দিকে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দড়ি টানিয়ে ঘটনাস্থল ঘিরে রাখা হয়েছে।