বর্তমান ডিজিটাল যুগে একজন মানুষকে অসংখ্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যাংকিং কিংবা অনলাইন কেনাকাটা—সব জায়গায় আলাদা আলাদা লগইন ক্রিডেনশিয়াল দরকার। মনে রাখার সুবিধার জন্য অনেকেই সব মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্মে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। কিন্তু এই অভ্যাসই হতে পারে ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ।

একই পাসওয়ার্ড বারবার ব্যবহার সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে সাধারণ ও মারাত্মক ভুলগুলোর একটি। এতে ব্যক্তিগত, আর্থিক ও পেশাগত তথ্য সহজেই হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে। একটি তথ্য ফাঁস থেকেই হ্যাকাররা একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর একাধিক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারে। ফলে বাড়ে ক্রিডেনশিয়াল স্টাফিং, ফিশিং ও পরিচয়চুরির মতো জটিল সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি। তাই নিজের অনলাইন উপস্থিতি সুরক্ষিত রাখতে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা জরুরি। সঙ্গে পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ও টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখলে নিরাপত্তা আরও দৃঢ় হয়।

একই পাসওয়ার্ড ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো একটি মাত্র ওয়েবসাইট হ্যাক হলে তার প্রভাব পড়ে অন্যান্য সব অ্যাকাউন্টে। কোনো জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের লগইন তথ্য ফাঁস হলে হ্যাকাররা সেই ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড অন্য সাইটেও ব্যবহার করে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করে। যদি ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড থাকে, তাহলে হ্যাকারদের জন্য ব্যবহারকারীর ডিজিটাল পরিচয়ে ঢুকে পড়া সময়ের ব্যাপারমাত্র। এতে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য মুহূর্তেই ঝুঁকিতে পড়ে। যেমন ২০১৩ সালে ইয়াহুর বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনায় লক্ষাধিক পাসওয়ার্ড চুরি হয়েছিল। সেই পাসওয়ার্ডগুলো পরে অন্যান্য ওয়েবসাইটেও ব্যবহার করা হয়। ফলে অনেক ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট একযোগে আক্রান্ত হয়। আলাদা পাসওয়ার্ড না থাকলে একবারের তথ্য ফাঁসই তৈরি করে ‘ডমিনো ইফেক্ট’। অর্থাৎ একটি হ্যাকড হওয়া পাসওয়ার্ড দিয়ে সব ওয়েবসাইটে হ্যাকড হওয়ার শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়।

প্রায় ৮০ শতাংশ তথ্য ফাঁস ঘটে চুরি হওয়া পাসওয়ার্ডের কারণে

একই পাসওয়ার্ড ব্যবহারে ব্যবহারকারীরা সহজেই ‘ক্রিডেনশিয়াল স্টাফিং’ আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এটি এমন একধরনের সাইবার অপরাধ, যেখানে হ্যাকাররা চুরি হওয়া ইউজারনেম পাসওয়ার্ড স্বয়ংক্রিয় বটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পরীক্ষা করে দেখে। অনেক ওয়েবসাইট একই ধরনের লগইন কাঠামো ব্যবহার করে, ফলে এক পাসওয়ার্ড একাধিক জায়গায় কাজ করতে পারে। হ্যাকিংসংক্রান্ত প্রায় ৮০ শতাংশ তথ্য ফাঁস ঘটে চুরি হওয়া পাসওয়ার্ডের কারণে। একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার মানে হ্যাকারদের হাতে নিজের ডিজিটাল জীবনের মাস্টার চাবি তুলে দেওয়া।

একই পাসওয়ার্ডে বাড়ে স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি

পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করলে পুনরুদ্ধারের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। যদি একাধিক অ্যাকাউন্টে একই রিকভার ই-মেইল বা ফোন নম্বর থাকে, তাহলে এক প্ল্যাটফর্মের তথ্য ফাঁস অন্য প্ল্যাটফর্মকেও প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সময় একই নিরাপত্তা প্রশ্ন বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের কারণেও ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে এক প্ল্যাটফর্মে পরিচয় যাচাই করতে গিয়ে অন্য অ্যাকাউন্টের তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে।

ফিশিং ও প্রতারণার সহজ শিকার

একই পাসওয়ার্ড ব্যবহারে ফিশিং ও সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রতারণার আশঙ্কা বেড়ে যায়। হ্যাকাররা প্রায়ই ভুয়া ওয়েবসাইট বানিয়ে ব্যবহারকারীদের সামনে আসল সাইট হিসেবে প্রদর্শন করে বিভ্রান্ত করে লগইন করতে প্রলুব্ধ করে। একবার কেউ সেই ফাঁদে পড়লে চুরি হওয়া পাসওয়ার্ড দিয়ে হ্যাকাররা সহজেই অন্যান্য অ্যাকাউন্টেও ঢুকে যেতে পারে।

একই পাসওয়ার্ডে ঝুঁকিতে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবন

একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত নয়, পেশাগত জীবনেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। অফিসের ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করলে তা কোম্পানির নিরাপত্তা নীতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা চাকরি হারানোর কারণও হতে পারে। ফ্রিল্যান্সার ও দূর থেকে (রিমোট) কাজ করেন এমন কর্মীরা আরও ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ, তাঁদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হলে গ্রাহকের তথ্য বা ব্যবসায়িক টুলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সুরক্ষিত থাকার উপায়

– একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার বন্ধ করাই নিরাপত্তা জোরদারের প্রথম পদক্ষেপ। নিচের কয়েকটি সহজ অভ্যাস ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

– পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করা: এটি প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড তৈরি ও সংরক্ষণ করে।

– টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা: এতে পাসওয়ার্ড ফাঁস হলেও বাড়তি এক স্তরের সুরক্ষা বজায় থাকে।

– নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা: সময় সময় পরিবর্তন করলে আগের তথ্য ফাঁসের প্রভাব কমে যায়।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: প ল য টফর ম অ য ক উন ট স রক ষ র জন য

এছাড়াও পড়ুন:

হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে জাবিতে বিক্ষোভ মিছিল

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।

শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে এই মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি প্রশাসনিক ভবন, ট্রান্সপোর্ট, চৌরঙ্গী হয়ে উপাচার্য বাসভবন পর্যন্ত যায়। এ সময় জুলাই হামলায় জড়িত শিক্ষকদের দ্রুততম সময়ে বিচারের দাবিতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।

মিছিলে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন জুলাই আন্দোলনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী কাজল মিয়া।

বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘হাদি ভাইকে গুলি করে, ইন্টেরিম কি করে’, ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘হাদি ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’, ‘বিচার বিচার বিচার চাই, সন্ত্রাসীদের বিচার চাই’, ‘একটা একটা লীগ ধর, ধইরা ধইরা জেলে ভর’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, “আজ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশে গুলি করা হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রশাসনের গড়িমসির ফলেই এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা হাদি ভাইয়ের সুস্থতা কামনা করি ও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে শনাক্ত করে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাই।”

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উপস্থিতিতেই জুলাই হামলায় জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝোলানোর ঘোষণা দেন তিনি।

জাকসুর সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক আহসান লাবিব বলেন, “অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়; অভ্যুত্থানপন্থী সরকার বা প্রশাসন দাবি করলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জুলাই হামলায় জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। আমরা এই প্রশাসনকে ধিক্কার জানাই। স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, যে প্রশাসন রক্তের বিচার করতে পারে না সেই প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের কোনো সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকতে পারে না।”

তিনি আরো বলেন, “আজ হাদি ভাইয়ের ওপর গুলি হয়েছে, কাল আমার ওপর হবে, পরশু আপনার ওপর হবে। প্রশাসন চেয়ারে বসে তামাশা দেখবে, তা হতে পারে না। এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতার অভাবের ফল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “জুলাই হামলায় জড়িত শিক্ষার্থীদের বিচার যেমন করেছি, শিক্ষকদেরও করব। ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধের ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”

ঢাকা/হাবীব/জান্নাত

সম্পর্কিত নিবন্ধ