শোলাকিয়ায় দেয়ালে গুলির চিহ্ন স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ভয়াবহ স্মৃতি
Published: 7th, July 2025 GMT
দেশ কাঁপানো নৃশংস জঙ্গি হামলার ৯ বছরেও সে দিনের ভয়াবহতা ভুলতে পারেননি কিশোরগঞ্জবাসী। ভয়ার্ত সেই দিনের কথা মনে পড়লে আজো শিউরে ওঠেন সবাই। স্বজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় শোলাকিয়ার মানুষদের। বাড়ি ঘরের দেয়ালগুলোতে এখনো যেন আবছা হয়ে ফুটে ওঠে গুলির চিহ্ন।
২০১৬ সালের ৭ জুলাই সকালের শুরুটা ভালো হলেও শেষটা মোটেই ভালো ছিল না। ঈদুল ফিতরের দিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে শোলাকিয়া ঈদগাহে ছিল মানুষের ঢল। আজিমউদ্দিন হাইস্কুল সংলগ্ন রাস্তার মুফতি মুহাম্মদ আলী মসজিদের সামনে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালায় অস্ত্রধারী জঙ্গিরা। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে জঙ্গিদের সঙ্গে চলে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ।
জঙ্গিরা গলাকেটে হত্যা করে পুলিশের দুই কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম ও আনসারুল হককে। আহত হয় পুলিশের অন্তত আটজন সদস্য। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ঘটনাস্থলে নিহত হন আবির রহমান নামে এক জঙ্গি। জঙ্গিদের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিজের ঘরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান গৃহবধূ ঝর্ণা ভৌমিক।
আরো পড়ুন:
গাজা যুদ্ধে প্রশ্নের মুখে বিবিসির সম্পাদকীয় নীতি
ঠাকুরগাঁওয়ে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা
শোলাকিয়া জঙ্গি হামলা ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে গুরুতর আহত অবস্থায় শফিউল ইসলাম ডন নামে এক জঙ্গি আটক হন। তানিম নামে স্থানীয় এক সন্দেহভাজন যুবককে আটক করা হয়।
এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ১৯ জন জঙ্গি হামলা চালাতে গিয়ে ও পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে বিভিন্ন সময় মারা যায়। পরে জেএমবি সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, আনোয়ার হোসেন, সোহেল মাহমুদ, রাজীব গান্ধী ও জাহিদুল হক তানিম নামে বাকি পাঁচজনকে মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি করা হয়। বর্তমানে ৫ জনের মধ্যে ৪ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, একজন কারাগারে আছেন।
মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুর রহমান ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দ্রুত স্বাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জবাসী।
জঙ্গি হামলার দিনের ঘটনাস্থল সবুজবাগ গলির নাম এখন ‘ঝর্ণা রানী ভৌমিক সড়ক’। গলির ভেতরে বিভিন্ন বাসার দেয়ালে এখনো গুলির চিহ্ন রয়েছে। এগুলো মুছে যায়নি। আট বছরেও এলাকাবাসী ভুলতে পারেননি সেই দুঃসহ স্মৃতি। সেই ভৌমিক নিবাসে আজও শোকের আবহ। যে জানালাটা ভেদ করে গুলি ভেতরে গিয়ে ঝর্ণা রানী মারা যান, সেই জানালাটার পাশে টানানো হয় ঝর্ণার ছবি। তার স্বামী গৌরাঙ্গ গত বছরের ১৮ জুন মারা গেছেন।
ঝর্ণা-গৌরঙ্গ দম্পতির সন্তান শুভ দেব পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখনো সেদিনের কথা মনে হলে তারা আঁতকে ওঠেন। বিশেষ করে তখন যারা ছোট ছিল, তাদের মন থেকে এ ঘটনার স্মৃতি দূর হচ্ছে না কিছুতেই।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন মুফতি মুহাম্মদ আলী মসজিদের ইমাম দ্বীন ইসলাম। তিনি বলেন, “সেদিনের ঘটনার কথা মনে পরলে আজও গা শিউরে ওঠে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।”
তিনি জানান, ওই দিন তিনি মসজিদেই ছিলেন। মসজিদের সামনে নিরাপত্তা চৌকিতে মুসল্লিদের তল্লাশি করছিল পুলিশ। এ সময় পুলিশের ওপরে আচমকা হামলা করে জঙ্গিরা। কি ভয়াবহ একটি দিন ছিল সেটি। চারিদিকে গুলি আর ভয়ার্ত মানুষের আত্মচিৎকার।
সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান রেনু। যিনি পুরো বিষয়টি পাঁচতলার বাসা থেকে দেখেছেন। তিনি জানান, পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের গোলাগুলির সময় কান ঝালাপালা অবস্থা। জঙ্গিরা ঢুকে পড়ে তার বাসার সামনে সবুজবাগ গলিতে। ভয়ে তার বাসার সবাই দরজা-জানালা বন্ধ করে মেঝেতে শুয়ে পড়েন।
তিনি জানান, বাসার চারতলায় গিয়ে জানালার পাশে অবস্থান নেন তিনি। তখন এক হামলাকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমা নিক্ষেপ করে। এ সময় একজন হামলাকারী হাতে থাকা চাপাতি ঘোরাতে ঘোরাতে পুলিশকে আক্রমণ করতে যায়। পুলিশ সদস্যরা গুলি করে চাপাতি হাতে থাকা জঙ্গিকে মাটিতে ফেলে দেন বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর জালাল উদ্দিন বলেন, “২০১৬ সালের ৭ জুলাই জঙ্গিরা শোলাকিয়ায় অর্তকিত হামলা করে। তারা তাদের অবস্থান জানান দিতেই মূলত হামলাটি করেছিল। এ ঘটনার পর সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা হয়। মামলাটি দীর্ঘ পরিক্রমায় চার্জশিট হয়।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে সন্ত্রাস দমন ট্রাইবুন্যাল-২ কিশোরগঞ্জে মামলাটি বিচারাধীন। ইতোমধ্যে ৭৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। শেষ পর্যায়ে ম্যাজিষ্ট্রেট, ডাক্তার, মামলার আইও সাক্ষীগ্রহণ রয়েছে। চলতি বছর ১৭ আগস্ট মামলার পরবর্তী তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, অতিদ্রুত এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচার কার্যক্রম শেষ হবে।”
ঢাকা/মাসুদ
.উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর ক শ রগঞ জ র রহম ন মসজ দ ঘটন র অবস থ
এছাড়াও পড়ুন:
বিশ্বে কি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বাড়ছে
ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়ায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দুটি বড় আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা বাড়ছে বলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অনেকে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি সম্ভাব্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। বর্তমানে পর্যবেক্ষণপদ্ধতি উন্নত হওয়ায় আগের তুলনায় মনে হচ্ছে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট সেমেরু আগ্নেয়গিরিতে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে গত ২২ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। অপরদিকে ইথিওপিয়ার হায়লি গুব্বি আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে প্রথমবারের মতো। দুটি আগ্নেয়গিরিতেই বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে।
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিএস) তথ্য মতে, পৃথিবীর গভীরে তাপমাত্রা এত বেশি যে কিছু শিলা ধীরে ধীরে গলে গিয়ে ম্যাগমা নামে পরিচিত একটি ঘন, প্রবাহিত পদার্থে পরিণত হয়। যেহেতু এটি চারপাশের কঠিন শিলার চেয়ে হালকা, তাই এই ম্যাগমা ওপরে উঠে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা চেম্বারে জমা হয়। অবশেষে তার কিছু অংশ ছিদ্র ও ফাটলের মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তখনই অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। একবার ম্যাগমা মাটির ওপরে বেরিয়ে এলে, তাকে লাভা বলা হয়।
কিছু আগ্নেয়গিরি ঘন ঘন বিস্ফোরিত হয়। আবার হায়লি গুব্বির মতো আগ্নেয়গিরি হাজার হাজার বছর শান্ত থাকতে পারে। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম ১৯৬৮ সাল থেকে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নথিভুক্ত করছে।
ইউএসজিএসের তথ্য মতে, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ বাড়ছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিশ্বজুড়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর বেশির ভাগই প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অব ফায়ার বরাবর অবস্থিত। এই অঞ্চলে বিশ্বের মোট সক্রিয় বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৭৫০ থেকে ৯১৫টির মতো আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ইউরোপের আইসল্যান্ডেও নিয়মিত অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। জলবায়ু ও জনসংখ্যার চাপ বাড়ার কারণে বর্তমানে অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব বেশি অনুভূত হলেও সামগ্রিক সংখ্যা বাড়ছে না।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া