ঝিনাইদহের ভুটিয়ারগাতি গ্রামটা নবগঙ্গা নদীর তীরে। সেই নদীই আমার প্রথম পাঠশালা। সেখানে আমি শিখেছি, পানি মানেই জীবন আর জীবন মানেই লড়াই।
ছোটবেলায় বুঝতাম না পৃথিবী কেমন। জানতাম শুধু নদীর পানিতে ডুব দিতে ভালো লাগে। যখন গ্রামের মেয়েরা পুতুল নিয়ে খেলত, আমি ছুটে যেতাম নদীর ঘাটে। আমি যেন নদীর ডাক শুনতে পেতাম আর ওই ডাকে সাড়া দিতাম প্রতিবার।
গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ সাঁতারটা ভালো চোখে দেখেন না। সাঁতারের পোশাক পছন্দ করেন না। অনেকে আমার পরিবারকে বলেছেন, আমি কেন সুইমিং করি। আত্মীয়স্বজনের অনেকে বলতেন, মেয়ে কেন খেলাধুলা করবে? তবে আমার মা-বাবা বলতেন, ‘ওর ভালো লাগলে খেলুক।’
বাবা আনিসুর রহমান একসময় পানের দোকানি ছিলেন, পরে মুদিদোকান চালাতেন। বাবা মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও ছিলেন কিছুদিন। আমরা দুই বোন, এক ভাই। বড় ভাই শামসুর রহমান নবগঙ্গা নদীতে সাঁতার শিখতেন জাহিদ মোল্লার কাছে, যিনি সম্পর্কে মামা হন। মায়ের অনুমতি নিয়ে ভাই সঙ্গে নিতেন আমাকে। শুরুতে ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু নবগঙ্গার পানি যেন আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। বড় ভাইয়ের মতো পরে জাহিদ মামার কাছে সাঁতার শিখেছি।
২০০৩ সালে প্রথম ঢাকায় আসি জাতীয় জুনিয়র প্রতিযোগিতায় খেলতে। ৮-৯ বছর বয়স। ঢাকার মিরপুর সুইমিংপুলে এক ইভেন্টে দ্বিতীয়, আরেকটায় তৃতীয় হয়েছিলাম। কী যে আনন্দ হয়েছিল, বোঝাতে পারব না। পদকগুলো সবাইকে দেখাতাম।
নদী থেকে পুলে
সেবারই প্রথম বুঝেছিলাম, আমার ভেতরে একটা শক্তি আছে। ঢাকায় এসেছিলাম অনেকের সঙ্গে। রাজধানী শহরের কিছুই চিনতাম না। মিরপুর সুইমিংপুলেই খেলা, ঘোরফেরা আর ওখান থেকেই বাড়ি ফেরা।
২০০৪ সালে শিশু একাডেমির প্রতিযোগিতায় দুটি সোনা জিতলাম—ফ্রিস্টাইল আর ব্যাকস্ট্রোকে। তারপর বগুড়ায় জাতীয় জুনিয়র গেমসে ছয় ইভেন্টে ছয়টিতেই দ্বিতীয়। তখন বিকেএসপির সোলেমান স্যার আমাকে দেখে বললেন, ‘তুমি বিকেএসপিতে ভর্তি হবে?’
তখন জানতাম না, বিকেএসপি কী। কিন্তু বলেছিলাম, ‘হব।’
১৪ দিনের ক্যাম্প শেষে ২০০৪ সালের নভেম্বরে বিকেএসপিতে ভর্তি হই। অচেনা জায়গা, কঠোর রুটিন। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, এই কষ্টই আমাকে গড়বে।
টুম্পা এখনো খেলে
২০০৭ সালে প্রথমবার ঢাকার মিরপুর সুইমিংপুলে সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতায় নামি। প্রতিযোগিতায় সম্ভবত সাতটা সোনা জিতি। সেই থেকে কখনো কোনো জাতীয় প্রতিযোগিতায় গরহাজির ছিলাম না। ১৬টি জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। প্রতিবারই পদক পেয়েছি। এই ৩২ বছর বয়সেও গত মাসে মিরপুরের পুলে ৩৪তম জাতীয় সাঁতারে ১৪টি ইভেন্টের ১১টিতে সোনা জিতেছি। বাকি ৩টি রুপা। ১১টি সোনার ৬টি ব্যক্তিগত, ৫টি দলীয়।
এখনো সুইমিংপুলে নেমে সোনা কুড়াই। একটা নেশায় যেন পেয়ে বসেছে। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, সিনিয়র পর্যায়ে জাতীয় প্রতিযোগিতায় আমি ১১০টির বেশি স্বর্ণপদক জিতেছি। রুপা-ব্রোঞ্জ মিলিয়ে পদক হবে দেড় শ। এখনো পুলে নামলে মানুষ অবাক হয়ে বলে, ‘টুম্পা এখনো খেলে?’
টুম্পা আমার ডাকনাম। হ্যাঁ, আমি এখনো খেলি। কারণ, আমি সাঁতার ভালোবাসি। আমার সময়ের সাঁতারুরা খেলে ছেড়েছেন বেশ আগেই। বাংলাদেশের মেয়েরা ‘কুড়িতে বুড়ি’—এই কথাকে আমি ভুল প্রমাণ করেছি।
ইন্দো-বাংলা গেমসে ৫০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে সোনা জিতেছি। অংশ নিয়েছি তিনটি দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস), দুটি অলিম্পিকে—২০১০ সালের যুব অলিম্পিকে (সিঙ্গাপুর) আর ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচবার খেলেছি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে খেলেছি স্বামী আসিফ রেজাসহ। হাঙ্গেরি, রাশিয়া, চীন, ভারত, নেপাল, আবুধাবির মতো দেশে খেলেছি।
এত দেশ দেখেছি, এত মানুষ চিনেছি; কিন্তু মনের গভীরে আমি এখনো নবগঙ্গার মেয়ে। যে জাতীয় প্রতিযোগিতায় সোনা জেতার সুবাদে বিকেএসপিতে বিনা বেতনে অনেকটা সময় পড়েছে। বিকেএসপিতে যখন ছিলাম, হয়তো ছুটি পেতাম না। হয়তো একটা গেম ছিল, ঈদে ছুটি দেয়নি। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারিনি। এমনও হয়েছে, ঈদের দিনও অনুশীলন করেছি। খারাপ লাগত। কিন্তু মনকে বোঝাতাম, খেলা শেষ হলেই বাড়ি যাব।
২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসারে চাকরি করেছি তিন বছর। আমার মা এখনো বলেন, ‘তুই ছোটবেলায় সংসারে টাকা দিয়েছিস। তুই বড় গুণী মেয়ে।’ ২০১৩ সালে যোগ দিই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে। এখন আমি প্রধান পেটি অফিসার। আমার স্বামী আসিফ রেজাও নৌবাহিনীতে। সে-ও সাঁতারু, জাতীয় প্রতিযোগিতায় সোনাজয়ী, বিকেএসপির শিক্ষার্থী। অনেকে আমাদের বলে ‘জলের দম্পতি’।
যেখানে কষ্ট
আমাদের সাঁতারে তেমন স্বীকৃতি নেই, নেই অর্থ। সর্বশেষ জাতীয় প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো পদক জেতার জন্য অর্থ পুরস্কার দিয়েছে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন। সোনার জন্য ২ হাজার, রুপায় ১ হাজার, ব্রোঞ্জে ৫০০ টাকা।
রিলে ইভেন্টে সেটা চারজনে ভাগ হয়ে যায়। সোনা জিতলে ৫০০ টাকা পড়ে একেকজনের ভাগে। ব্রোঞ্জের জন্য ২০০ টাকাও না। অন্যদিকে ক্রিকেট-ফুটবলের মেয়েরা লাখ লাখ টাকা পায়, মিডিয়ায় আসে প্রতিদিন। আমরা পুলের পানিতেই ঘাম ঝরাই, কারও চোখে পড়ি না।
মাত্রই ফুটবলের মেয়েদের সরকার ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে ওঠার জন্য। যুব এশিয়া কাপে ব্রোঞ্জ জেতায় নারী হকি দল পেয়েছে ২১ লাখ টাকা। ফুটবলের মেয়েরা জনপ্রতি দেড় লাখ টাকার বেশি আর হকির মেয়েরা পেয়েছে জনপ্রতি এক লাখ টাকা।
তারপরও আমরা সাঁতরাই, ভালোবেসেই পানিতে নামি। কেউ সাঁতরান একটা চাকরির আশায়। আমাদের সাঁতারে বছরে একটামাত্র জাতীয় প্রতিযোগিতা হয়। সেটা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত খরচই হয়ে যায় অনেক টাকা। নিয়মিত অনুশীলন, খাবার, পোশাক ইত্যাদির জন্য ৩০-৫০ হাজার টাকা লাগে।
রাষ্ট্র, বিভিন্ন সংস্থা ক্রীড়াক্ষেত্রে পুরস্কার দেয়, কিন্তু সুইমিংয়ের জন্য কিছু্ই থাকে না। আমাদের ফেডারেশন বা সংস্থা দেয়, ওটাই আমাদের প্রাপ্তি।
জাতীয় প্রতিযোগিতায় সোনা জিতলে সংস্থা থেকে ৫ হাজার টাকা করে দেয়। এবার ১১টা সোনার জন্য আমার ৫৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা, এমন হিসাব করলে ভুল হবে। এর মধ্যে ৫টি সোনা যে রিলেতে। এই টাকা চারজনের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
তবু স্বপ্ন
মাঝেমধ্যে মনে হয়, আর খেলব না। তারপরও খেলি। কারণ, আমি সাঁতারেই জীবন বেঁধেছি। এখন শুধু চাওয়া একটাই—আমার দেশের মেয়েরা যেন সাঁতার শিখতে ভয় না পায়। তারা যেন ভাবে, ‘টুম্পা পারলে আমরাও পারি।’ এই দেশে নারী খেলোয়াড় মানেই সংগ্রামী মানুষ। তাদের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণ, সঠিক মূল্যায়ন—এমনকি সামান্য সম্মান—সবই অপ্রতুল।
সাঁতারের জীবন খুব কঠিন। ভোরে উঠে পুলে নামতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন। একদিন না নামলে ফিটনেসে ঘাটতি দেখা দেয়। সুইমিং কেউ দেখতেও আসে না। অথচ সুইমিং দেখতে টিকিট লাগে না।
আমার বাবার শরীর এখন ভালো নয়। মা বলেন, ‘আর খেলিস না, বিশ্রাম নে।’ হাসি দিয়ে বলি, ‘আরেকটা জাতীয় গেম শেষ হোক, তারপর দেখি।’ মা বোঝেন না, খেলাটা আমার ধমনিতে। তবে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে। হয়তো এবার বিদায় বলব।
আমার ঘরে যত পদক আছে, তার প্রতিটা আমার জীবনের একটা অধ্যায়। প্রতিটা সোনার পেছনে আছে ব্যথা, ঘাম আর নীরব কান্না। কখনো কখনো রাতে ঘুম ভেঙে দেখি, হাত-পা এখনো ব্যথায় টনটন করছে। তবু মন চায় সকালে আবার পুলে নামতে।
২০০৩ থেকে ২০২৫ সাল—২২ বছরের সাঁতারুজীবনে নিজের প্রতি সৎ থেকেছি। খেলাকে ভালোবেসেছি এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে চেয়েছি। নবগঙ্গার পানিতে আমি জীবন লিখেছি।
সোনিয়া আক্তার, জাতীয় সাঁতারু
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ব ক এসপ ত নবগঙ গ র আম দ র র জন য র জ বন
এছাড়াও পড়ুন:
সাভার–ধামরাইয়ের কৃষক রক্ষায় পদক্ষেপ নিন
ঢাকার সাভার ও ধামরাই—এ দুই গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় কৃষিজমি দ্রুত কমে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং শিল্পবর্জ্যের ভয়াবহ দূষণ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দশকে এ অঞ্চলে শিল্পকারখানার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯৪ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৩২–এ দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কৃষিজমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, সাভারে যা ২ হাজার ৫১০ হেক্টর ও ধামরাইয়ে ১ হাজার ১২৭ হেক্টর। শিল্প ও কৃষির মধ্যকার অসম লড়াইয়ে এভাবে কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাওয়াটা খুবই উদ্বেগজনক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহায়তায় করা নমুনা পরীক্ষায় এ বিপর্যয়ের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলেছে। এর থেকে জানা যাচ্ছে, কারখানার নালা এবং কৃষিজমির জমা পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ (ডিও) এত কম যে জলজ জীবন প্রায় ‘প্রাণঘাতী পর্যায়ে’ চলে গেছে। পানিতে অ্যামোনিয়া, ফসফেট ও নাইট্রেটের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ট্যানারিশিল্পের ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়াম এবং ডাইং ও ওষুধ কারখানার নিকেল ও সিসা মাটিতে মিশে মাটিকে বিষাক্ত করছে।
গবেষকেরা বলছেন, ভারী ধাতুগুলো মাটি থেকে শস্যে চলে যাচ্ছে। এর ফলে ফসলের গুণাগুণ পরিবর্তিত হচ্ছে, উৎপাদন কমছে এবং এই ধাতুগুলো খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এই দূষণের মূল কারণ হলো শিল্পকারখানার মালিকদের আইন না মানার প্রবণতা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর উদ্যোগের অভাব।
নগরবিদদের মতে, আইন ও নীতি অনুযায়ী শিল্পকারখানা নির্দিষ্ট এলাকায় হওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। কারখানাগুলো কৃষিজমির ভিত উঁচু করে গড়ে উঠছে এবং তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন না করেই অবাধে সেগুলো নালা, খাল এবং নদীনালার মধ্য দিয়ে কৃষিজমিতে ফেলছে। স্থানীয় খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে সরু হয়ে যাওয়ায় কারখানার বর্জ্য উপচে কৃষিজমিতে জমা হচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, একসময় যে জমি থেকে ২৫ মণ ধান পাওয়া যেত, এখন সেখানে চাষ করাই সম্ভব হচ্ছে না। তখন কম দামে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। তাঁদের বক্তব্য, ‘কারখানার পচা পানির কারণে ফসল হয় না, হুদাই খাজনা দিতে হয়।’
স্থানীয় প্রশাসনকে অভিযোগ জানিয়েও কোনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। ‘গায়ের জোরে’ শিল্পমালিক নিজ স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংস করছেন আর প্রশাসন যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। পরিবেশ রক্ষার আইন থাকা সত্ত্বেও কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও যখন তা প্রয়োগ হয় না, তখন বোঝা যায় মুনাফার কাছে পরিবেশ ও জীবনের মূল্য কত তুচ্ছ।
এ পরিস্থিতি কেবল পরিবেশদূষণ বা কৃষিজমি কমার সমস্যা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সুশাসনের ওপর একটি বড় আঘাত। রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে কার্যকর তদারকি এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দূষণকারী শিল্পকারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। নিয়মিত মাটি ও পানি পরীক্ষা করে ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রবেশ বন্ধ করা আবশ্যক।