মৌলভীবাজারে আশুরার দিনে গায়েবি মোকামে মাতম-বিলাপের জারি
Published: 7th, July 2025 GMT
কবে থেকে পবিত্র আশুরার দিনে মৌলভীবাজারে গায়েবি মোকাম ঘিরে মাতম-বিলাপ করা, জারি গাওয়া শুরু হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট কোনো সাল-তারিখ কারও জানা নেই। পূর্বপুরুষেরা ওই দিনে গায়েবি মোকাম প্রাঙ্গণে এ রকম জারি করেছেন, মাতম করেছেন। ঐতিহ্য হিসেবে সেই ধারাবাহিকতা এখনো সীমিত পরিসরে হলেও টিকিয়ে রেখেছেন তাঁদের উত্তরাধিকার, স্থানীয় মানুষ। মহররমের ১০ তারিখ আশুরার দিন, যা অনেকের কাছে কতলের দিন নামে পরিচিত। সেই দিনে একদল তরুণ-প্রবীণ জারি গেয়ে দিনটিকে স্মরণ করেন, করুণ কাহিনি নিয়ে বিলাপ করেন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গয়ঘরে খোজার মসজিদ এলাকায় রয়েছে এই গায়েবি মোকাম। আশুরার দিন বিকেলে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেক নারী-পুরুষ এখানে সমবেত হন। তরুণ-প্রবীণ মিলে জারি গাইতে গাইতে বিলাপ করেন, শোক প্রকাশ করেন। ১০ মহররম সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.
গতকাল রোববার বিকেলে ঝমঝমে বৃষ্টি নামে। আগে থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল, এই মেঘ, এই রোদের কিছুটা খেলা ছিল। ওই সময় গয়ঘর খোজার মসজিদের কাছাকাছি গায়েবি মোকামের কাছে জারি গাওয়ার জন্য অনেকে সমবেত হতে শুরু করেছেন। অনেকে জারি শুনতে, অংশ নিতে নানা জায়গা থেকে আসছেন। এখানে আশুরার দিনে জারি গাওয়ার প্রচলন আছে শত বছরের। আগের সেই জমজমাট অবস্থা এখন আর নেই। তারপরও প্রচলিত ধারায় ছেদ পড়েনি। স্থানীয় অপেশাদার জারিশিল্পীরা তা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। বৃষ্টি থামতেই অনেকে ছুটে আসেন। ভিড় করেন গায়েবি মোকামের কাছে। সবাই মিলে গায়েবি মোকাম ঘিরে কয়েক চক্কর দিয়ে একটা সময় শুরু হয় জারি গাওয়া। কারবালার প্রান্তরের শহীদদের জন্য বুকের কান্না তাঁরা ঢেলে দেন জারির কথা ও সুরে। কারবালার কাহিনির নানা অংশ গাইতে গাইতে মাতম করেন। এ উপলক্ষে নানা পণ্যের কিছু দোকানও বসেছিল স্থানটিতে।
গয়ঘর গ্রামটি খোজার মসজিদের নামে অনেকের কাছে পরিচিত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের কারণে অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচশত বছর আগের এই ‘গয়ঘর ঐতিহাসিক খোজার মসজিদ’। মসজিদটি নির্মাণ করা হয় সুলতান বরবক শাহের পুত্র সুলতান শামস উদ্দীন ইউছুফ শাহের আমলে। হাজী আমীরের পৌত্র ও মুসার পুত্র বিখ্যাত মন্ত্রী মজলিস আলম ৮৮১ হিজরিতে (১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) এই মসজিদ নির্মাণ করান। এই খোজার মসজিদের পূর্ব দিকেই একটি ছোট মোকাম আছে, যা স্থানীয় মানুষের কাছে গায়েবি মোকাম নামে পরিচিত। গায়েবি টাকায় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে লোকমুখে গায়েবি মোকাম নামে এই মাজারের পরিচিতি আছে।
স্থানীয় জারিশিল্পী আছকর মিয়া জানান, মহররম মাসে গয়ঘরের গায়েবি মোকামের কাছে পূর্বপুরুষ থেকে জারি গাওয়া হয়ে আসছে। কবে, কখন থেকে এই জারি গাওয়া শুরু হয়েছে, কেউ বলতে পারেন না। তবে এখন আর আগের মতো জারির আয়োজন জমজমাট হয় না। আগে তাঁবু বসানো হতো, আশপাশের গ্রাম থেকে অনেক লোকজন আসতেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, স্থানীয় এক ব্যক্তির ঘরে গায়েবি টাকা ওঠে। ওই বাড়ির কেউ একজনকে স্বপ্নে মোকাম তৈরির জন্য বলা হয়। তখন মোকামের স্থানটিতে বিশাল একটি বটগাছ ছিল। সেই গাছ একসময় গোড়াসহ উপড়ে পড়ে। তারপর গায়েবিভাবে পাওয়া টাকা দিয়ে বটগাছের স্থানটিতে এই মোকাম তৈরি করা হয়েছে। কারও নামে এই মোকাম তৈরি হয়নি।
আছকর মিয়া বলেন, ‘জারি কারবালার কাহিনি। বিষাদ সিন্ধু থেকে জানছি। কারবালার ইতিহাস পড়ছি। জারিটা হলো বিলাপ। কারবালার কাহিনি বলতে গিয়ে লোকজন বিলাপ করছে, কাঁদছে। এটারে আমরা একটু জারি হিসেবে গাই। আমরা যত জারি গাই, তার অর্থ আছে। এই কাহিনি “বিষাদ–সিন্ধু”, “জমজমা”, “জঙ্গে কারবালা”তে পাওয়া যাবে।’
আরেক জারিশিল্পী কনর মিয়া বলেন, ‘আমরার জন্মের আগে থেকে ময়-মুরব্বিরা এখানে (গায়েবি মোকাম) জারি গাইছেন। এখন আমরা গাই। আমরা শুনছি এটা কারবালার ইতিহাস, সেই ইতিহাসটারে আমরা স্মরণ করি। ৫ মহররম থেকে শুরু হয়, ১০ মহররম কতলের দিনে (আশুরা) জমজমাট হয়। এরপরে কেউ যদি বলে, গাওয়া হয়। তবে আগে গাওয়া যেত, এখন গাওয়ার মানুষ নাই।’
রোববার বিকেলে যখন তরুণ ও প্রবীণরা মিলে জারি গাইছিলেন, মাতম করছিলেন। তখন পশ্চিমের আকাশে মেঘের কোলে লাল রং ছড়িয়ে দিয়েছিল বিদায়বেলার সূর্য। এ যেন কাজী নজরুল ইসলামের মহররম কবিতার মতো ‘কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে/সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে!’ গায়েবি মোকামের প্রাঙ্গণ তখন একটুকরা ফোরাতের তীরই যেন হয়ে উঠেছিল। সবাই মিলে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মুহূর্তটিকে মনে করে প্রকৃতই কাতর হয়ে উঠেছিলেন। বুকের কান্নাকে তাঁরা জারির পঙ্ক্তি, তাল ও লয়ে প্রকাশ করতে থাকেন। তখন ধীরে ধীরে বিকেলটা সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকছে, অন্ধকারের পর্দা নামছে চরাচরে। জারির আহাজারিতে সেই অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে উঠছে, আরও ইতিহাস–কাতর হয়ে উঠছে।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: খ জ র মসজ দ ক রব ল র ব ল প কর পর চ ত
এছাড়াও পড়ুন:
বিশ্বে কি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বাড়ছে
ইন্দোনেশিয়া ও ইথিওপিয়ায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দুটি বড় আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা বাড়ছে বলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অনেকে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি সম্ভাব্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। বর্তমানে পর্যবেক্ষণপদ্ধতি উন্নত হওয়ায় আগের তুলনায় মনে হচ্ছে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট সেমেরু আগ্নেয়গিরিতে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে গত ২২ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। অপরদিকে ইথিওপিয়ার হায়লি গুব্বি আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে প্রথমবারের মতো। দুটি আগ্নেয়গিরিতেই বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে।
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিএস) তথ্য মতে, পৃথিবীর গভীরে তাপমাত্রা এত বেশি যে কিছু শিলা ধীরে ধীরে গলে গিয়ে ম্যাগমা নামে পরিচিত একটি ঘন, প্রবাহিত পদার্থে পরিণত হয়। যেহেতু এটি চারপাশের কঠিন শিলার চেয়ে হালকা, তাই এই ম্যাগমা ওপরে উঠে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা চেম্বারে জমা হয়। অবশেষে তার কিছু অংশ ছিদ্র ও ফাটলের মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তখনই অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। একবার ম্যাগমা মাটির ওপরে বেরিয়ে এলে, তাকে লাভা বলা হয়।
কিছু আগ্নেয়গিরি ঘন ঘন বিস্ফোরিত হয়। আবার হায়লি গুব্বির মতো আগ্নেয়গিরি হাজার হাজার বছর শান্ত থাকতে পারে। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম ১৯৬৮ সাল থেকে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নথিভুক্ত করছে।
ইউএসজিএসের তথ্য মতে, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ বাড়ছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিশ্বজুড়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর বেশির ভাগই প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অব ফায়ার বরাবর অবস্থিত। এই অঞ্চলে বিশ্বের মোট সক্রিয় বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৭৫০ থেকে ৯১৫টির মতো আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ইউরোপের আইসল্যান্ডেও নিয়মিত অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। জলবায়ু ও জনসংখ্যার চাপ বাড়ার কারণে বর্তমানে অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব বেশি অনুভূত হলেও সামগ্রিক সংখ্যা বাড়ছে না।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া