হাওর রক্ষায় পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার: পরিবেশ উপদেষ্টা
Published: 8th, July 2025 GMT
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, হাওর রক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি হাওরে বাঁধ নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, পর্যটন সুরক্ষা ও নীতিমালা প্রণয়নসহ চারটি প্রধান পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউর) শফিকুল কবির মিলনায়তনে হাওরের সংকট ও সম্ভাবনা শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, হাওরের ইকো সিস্টেম পৃথিবীতেই বিরল। এটিকে অবশ্যই সুরক্ষিত করতে হবে। হাওরের সীমানা নির্ধারণ করে কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলনের মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।
এ সময় পরিবেশ উপদেষ্টা হাওর অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে ‘ভাসমান হাসপাতাল’ চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। পাশাপাশি হাওরের মাছের উৎপাদন ও আহরণের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন।
সেমিনারে কি-নোট উপস্থাপন করেন সংগঠনের অর্থ সম্পাদক, কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ মোফাজ্জল।
সংগঠনের সভাপতি রফিক মুহাম্মদের সভাপতিত্বে সেমিনারে আলোচক ছিলেন জাতিসংঘের সাবেক পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মোশতাক আহমেদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মাহবুব হাসান শাহীন, বিএনপির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, গ্রিন কনসার্ন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা খানম, বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভির বার্তা সম্পাদক ইলিয়াস হোসাইন প্রমুখ।
এতে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান। ঢাকাস্থ নেত্রকোণা সাংবাদিক ফোরামের উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, আগাম বন্যা বা অন্যান্য কারণে হাওরের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে তার তীব্র নেতিবাচক প্রভাব আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ে। তাই জাতীয় সম্পদ হাওরকে রক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
তারা বলেন, বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হাওরের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। তার প্রভাব চালের বাজারসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়ে। তাই যে জনগোষ্ঠী আমাদের নাগরিক জীবন ও অর্থনীতিতে এতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তারা তাদের জীবনের নাজুক অবস্থা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় প্রতি বছর তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
কি-নোটে মুহাম্মদ মোফাজ্জল বলেন, হাওর এলাকার জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপুষ্টিতে ভোগে। রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবা তাদের জন্য দুর্গত। জল যার জলা হবে ভার বলা হলেও সম্পদ এখনও ক্ষমতা ও বৃত্তবন্দি। অন্যদিকে হাওরের জীববৈচিত্র সংকটাপন্ন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জীববৈচিত্র রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যতটা প্রয়োজন তা পরিলক্ষিত হয়নি। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব ও অন্যান্য সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে তা হাওর অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে সংকটপূর্ণ করার পাশাপাশি আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে।
.উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: পর ব শ পর ব শ উপদ ষ ট হ ওর র
এছাড়াও পড়ুন:
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষা ও এর সংরক্ষণ
বাংলাদেশের ছোট ভূখণ্ডে বহু জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের বসবাস। ইতিহাস, ভূগোল ও বিভিন্ন সময়ের আগমনপ্রবাহ মিলিয়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। এখানে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের গৌরবময় অংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, শুধু শেরপুর জেলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৮৪০, যাদের মধ্যে গারো, কোচ, বর্মণ, হাজং, ডালু, হুদি, পাত্র, সৌরা, মসুর, মারমা, ম্রো, চাক, মাহালিসহ ১৬টিরও বেশি সম্প্রদায় রয়েছে। প্রতিটি গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা, যা তাদের অস্তিত্বের মূল পরিচয়।
আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত ভাষা ৩৫টির বেশি। এই ভাষাগুলো মূলত তিনটি বৃহৎ ভাষা পরিবারে বিভক্ত। তিব্বত-বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, ম্রো, বম, লুসাই প্রভৃতি। এগুলো স্বরনির্ভর এবং প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির প্রভাব বহন করে।
এদিকে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহার করে সাঁওতাল, খাসি, মান্দি, ওঁরাও প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী। তাদের ভাষার শব্দভান্ডার প্রকৃতি, কৃষি, নদী-জঙ্গলকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে রোহিঙ্গা, কোচ, বেলে ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোয় আরবি-ফারসি শব্দের প্রভাব স্পষ্ট।
ব্রিটিশ শাসনামলে মিশনারি বিদ্যালয়গুলোয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ ছিল; অনেক ভাষার জন্য লিপিও উদ্ভাবন করা হয়েছিল। তবে প্রশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থায় বাংলা, ইংরেজি এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে উর্দুর একক আধিপত্য তাদের ভাষাশিক্ষার সুযোগ ক্রমে সংকুচিত করে দেয়।
স্বাধীনতার পর ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঁচটি মাতৃভাষায় বই প্রণয়ন, গবেষণা ও ভাষা নথিভুক্তকরণে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বইয়ের স্বল্পতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অনেক জাতিগোষ্ঠী ভারত থেকে শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকায় তারা আবার বাংলায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ঘাটতি মানুষকে শহরমুখী করছে। শহরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রভাব বিস্তার, গণমাধ্যমের ভাষাগত আধিপত্য এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা-অবহেলা শিশুদের ভাষাগত চর্চা দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে মাতৃভাষা ব্যবহার করায় হেনস্তা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের। অনেকে মানসিক চাপ সইতে না পেরে পড়াশোনা কিংবা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
চাকমা, খুমি, খিয়াং, পনু, ম্রো, লুসাই, কচ, রং, পাংখোসহ বহু ভাষা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সংস্কৃতির স্বাদ, ইতিহাস, পরিচয় ও জীবনের নিজস্ব অর্থ। এ দেশের মানুষ ভাষার মর্যাদার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছে। মাতৃভাষার প্রতি সেই শ্রদ্ধা যদি আজ বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা আমাদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।
বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষা করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিয়মিত সরবরাহ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনে অনুবাদক নিয়োগ, সমাজে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ভাষা সংরক্ষণে অভিধান, ব্যাকরণ, লিখিত রূপ তৈরি, ভাষার সমান অধিকার নিশ্চিতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
কোনো ভাষাগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কখনোই একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। আর উন্নতির সেই যাত্রায় ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় ও মর্যাদার বাহক। দেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লাবনী আক্তার শিমলা শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়