সৌদি আরবে এক দশকে মাদক পাচারের অপরাধে ৬০০ জনের মৃত্যুদণ্ড, অধিকাংশই বিদেশি
Published: 8th, July 2025 GMT
সৌদি আরব গত এক দশকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে যে পরিমাণ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, তা রীতিমতো ‘আতঙ্কজনক’। এসব মানুষের অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক। এমনটাই জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে প্রায় ৬০০ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এঁদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই ছিলেন পাকিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া ও মিসরের মতো দেশ থেকে আসা বিদেশি নাগরিক।
২০২১ ও ২০২২ সালে অস্থায়ীভাবে মাদকসংশ্লিষ্ট মৃত্যুদণ্ড বন্ধ রাখার পর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা আবার রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যায়। শুধু ২০২৪ সালেই ১২২ এবং চলতি বছর (জুন পর্যন্ত) আরও ১১৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি বলছে, এসব মৃত্যুদণ্ড ‘অন্যায্য বিচার’ এবং ‘মানবজীবনের প্রতি নিদারুণ অবহেলার’ মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। এসব মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় খুব কমই আন্তর্জাতিক নজরদারি রয়েছে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, এভাবে চলতে থাকলে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা আরও বাড়বে।
অ্যামনেস্টির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ডানা আহমেদ বলেন, ‘আমরা এক ভয়ংকর প্রবণতা দেখছি। বিদেশিদের এমন অপরাধে অপ্রত্যাশিত হারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে, যেসব অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানই থাকা উচিত নয়।’
ডানা আরও বলেন, সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা করানো এমনিতেই কঠিন। কারণ, দেশটির অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি। এখন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এই নজরদারিও আরও কমে গেছে।
অ্যামনেস্টি বলেছে, অনেক বিদেশি কাজের খোঁজে সৌদি আরবে গিয়ে মাদক পাচারের ফাঁদে পড়েন। তাদের ঠকানো হয় এবং অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। তাদের যেটুকু আর্থিক লাভ দেওয়া হয়, সেটি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
একটি ঘটনায় দেখা গেছে, সাতজন ইথিওপীয় এবং একজন সোমালি নাগরিককে ১৫৩ কেজি গাঁজা পাচারের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মাদকের বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ লাখ ডলার হলেও আদালতে তারা বলেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে মাত্র ২৬৭ মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, যেসব বিদেশি দরিদ্র, কম শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে, তাঁরা সহজেই প্রতারণার শিকার হন এবং সৌদি আরবে আইনগত সহায়তা পাওয়াও তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অনেকেই আইনজীবী পাননি। নিজ দেশের কূটনৈতিক সহায়তা খুবই কম ছিল এবং প্রয়োজনীয় দোভাষী সুবিধাও পাননি।
অন্তত চারটি ঘটনার নথিতে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বলেছেন, তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।
আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো অনেক বন্দী জানতেনই না, তাঁদের আপিলের কী অবস্থা বা কবে তাদের ফাঁসি হবে। কিছু ব্যক্তিকে তো মৃত্যুর এক দিন আগে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, পরদিন তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে।
অ্যামনেস্টির আঞ্চলিক উপপরিচালক ক্রিস্টিন বেকারলে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড হলো সবচেয়ে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর শাস্তি।’
মৃত্যুদণ্ড কার্যক্রম বন্ধ করতে এবং মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে সৌদি আরবের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: অ য মন স ট অপর ধ
এছাড়াও পড়ুন:
ইউক্রেনে মিসাইলে, ভূমধ্যসাগরে জলদস্যুদের গুলিতে আমরা মরবই?
১৭ নভেম্বর প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার একটি খবরের শিরোনাম হলো, ‘লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর উপকূলে নৌকা ডুবে ৪ বাংলাদেশির মৃত্যু’। আল–জাজিরার সূত্রে খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ১৩ নভেম্বর রাতে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি দিতে যাওয়া দুটি নৌকা লিবিয়ার উপকূলে ডুবে যায়। এর মধ্যে একটি নৌকায় বাংলাদেশ থেকে আসা ২৬ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজন মারা যান। অন্যদের উদ্ধার করা হয়।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের লাওখণ্ডা গ্রামে। দুজনেই তরুণ। এনামুল শেখের বয়স ২৭ আর আনিস শেখের বয়স ২৫। গত ১০ অক্টোবর তাঁরা বাংলাদেশ ছাড়েন। চার ভাইয়ের মধ্যে এনামুল ছিলেন সবার ছোট। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতেই তাঁর এই অগস্ত্যযাত্রা। আর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন নার্সের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আনিসের। তাঁদের সংসারে সাড়ে তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান আছে।
আরও পড়ুনএত উন্নয়নের পরও কেন ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে আমাদের তরুণেরা২৬ আগস্ট ২০২৩ভাগ্য ফেরাতে ইতালি যাওয়ার জন্য তাঁরা মাদারীপুরের একজন দালালকে ২১ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। লিবীয় রেড ক্রিসেন্টের প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো মৃতদেহ গাড়িতে তোলা হচ্ছে। প্রিয়জনদের লাশ দেশে কবে ফিরবে, শেষ দেখাটা দেখতে পাবেন কি না, সেটাই এখন স্বজনদের একমাত্র আর্তনাদ।
মাদারীপুরের টগবগে তরুণ মুন্না তালুকদার। মাত্র ১৯ বছরে থেমে গেছে তাঁর জীবন। সাড়ে ২২ লাখ টাকায় বডি কন্ট্রাক্ট বা শরীর চুক্তি করে ইতালি পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেই বডিটাই এখন মায়ের কাছে ফিরবে কি না, সেটাই বড় সংশয়। দালালেরা বলেছে, জলদস্যুদের গুলিতে রাজৈর উপজেলার বায়েজিদ শেখ নামের আরেক তরুণের সঙ্গে মুন্না গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে মুন্নার মা রাবেয়া বেগমের সেই আর্তিই শোনা যাচ্ছে: ‘দালাল আমার বাবারে বডি কন্ট্রাক্ট (শরীর চুক্তি) কইরা নিছে। বলছে, য্যামনে হোক, ইতালি লইয়া যাইবে। সাড়ে ২২ লাখ টাকা লইয়া ভাগছে। ওরা আমার বাবারে খারাপ নৌকায় দিয়া মাইরা ফালাইছে। দয়া কইরা আমার বাবার বডি (শরীর) আম্মেরা আইনা দেন। আম্মেগো পায় ধরি, আমার বাবার লাশটা আইনা দেন।’ (আম্মেগো পায় ধরি, আমার বাবার লাশটা আইনা দেন’ ১৯ নভেম্বর, ২০২৫)
সাড়ে ১৫ বছর বলি, আর ৫৪ বছর বলি, এতগুলো বছরের জঞ্জাল দেড় বছরে ধুয়ে–মুছে ফেলা অসম্ভব। যে তরুণদের কর্মসংস্থানের বঞ্চনা নিয়ে চব্বিশের অভ্যুত্থানের সূচনা, তাঁদের কর্মসংস্থান, জীবনমান পাল্টানোর দৃশ্যমান কোনো প্রচেষ্টা, উদ্যোগ কোথাও দেখা যায়নি। বরং নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আবির্ভাব হতে দেখছি। আর ধীরে ধীরে বাদ পড়ে গেছেন শ্রেণি–পেশা–জাতি–লিঙ্গ নির্বিশেষে অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীরা।প্রথম আলোর মাদারীপুর প্রতিনিধি অজয় কুণ্ডুর একই প্রতিবেদনে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ইতালিযাত্রার একটা পথরেখা জানা যায়। ১২ অক্টোবর ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ঘর ছাড়েন মুন্না। প্রথমে তাঁকে সৌদি আরবে নেওয়া হয়। পরে ওমরাহ হজ করতে যান মুন্না। হজ শেষে তাঁকে কুয়েত নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন রেখে নেওয়া হয় মিসরে। তারপর উড়োজাহাজে লিবিয়ার বেনগাজিতে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে লিবিয়ার মিসরাতা শহরের নেওয়া হয়। ১ নভেম্বর মুন্নাকে লিবিয়ার উপকূল থেকে নৌকায় ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়। একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অন্য অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মুন্নাকে তুলে দেয় দালাল চক্র। মুন্নাকে বহন করার নৌকাটি ভূমধ্যসাগরের কিছু দূর যাওয়ার পরই মাফিয়াদের (জলদস্যুদের) হামলার শিকার হয়।’
ভাগ্য বদলাতে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথে বাংলাদেশি তরুণদের এই আত্মহনন নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নৌকা ডুবে ৮ বাংলাদেশি মারা যান। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোটের হস্তক্ষেপে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। এর পর থেকে দেশটি দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে লিবিয়া হয়ে ওঠে বিশ্বের সংঘাতকবলিত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো থেকে ইউরোপমুখী অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম ট্রানজিট রুট।
আরও পড়ুনটাইটানের ধনী অভিযাত্রীরা বনাম ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির হতভাগারা২৩ জুন ২০২৩আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার বরাতে ২০২৪ সালের মে মাসে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৪-২০২৪ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত অন্তত ২৮৩ জন বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে জীবন হারিয়েছেন। লিবিয়ায় অভিবাসী ও শরণার্থীদের আটকে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও নিয়মিত। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশি তরুণেরা কেন এমন মরিয়া হয়ে বডি কন্ট্রাক্ট করছেন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপযাত্রা সবচেয়ে বিপজ্জনক রুটগুলোর একটি। ২০১৪-২০২৪—এই ১০ বছরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এই পথে পাড়ি দিতে গিয়ে মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।
বাংলাদেশি তরুণদের জীবন বাজি রেখে ভাগ্য ফেরানোর এই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের ২৫ বছরের যুবক আকরাম হোসেন ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে মিসাইলের আঘাতে নিহত হওয়ার পর সবার নজরে আসে। ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শিখে তিনি রাশিয়ায় যান। কিন্তু দালালেরা তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে ‘চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা’ হিসেবে নিয়োগ করে। ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় ইউক্রেনে। গত ১৪ এপ্রিল সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ধারদেনা করে সাত লাখ টাকা জোগাড় করে পরিবার তাঁকে পাঠিয়েছিল রাশিয়ায়।
অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা যাচ্ছেন অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী। এমন ঘটনা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশিদের নামও উঠে আসছে প্রায় সময়।