জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ী ইউনিয়নটি যমুনা নদীর তীরবর্তী। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে তলিয়ে যায় এ ইউনিয়নের গ্রামগুলো। বালুগ্রাম দক্ষিণের মর্জিনা বেগম (৪৫) ডান হাতের চার আঙুল দেখিয়ে বললেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কমপক্ষে চারবার বন্যায় ডোবে তাঁদের গ্রাম। বন্যার হিসাব করেই ফসল ও সবজির আবাদ করা হয়। তবে এ বছর ঈদুল আজহার আগে চার-পাঁচ দিনের বন্যা সেই হিসাবেও ‘গন্ডগোল’ বাধায়।

আকস্মিক সেই বন্যায় ফসল নষ্ট হয়। রোজগারহীন হয়ে পড়েন কৃষি শ্রমজীবী মর্জিনার মতো অন্য নারীরা। তাঁদের মধ্যে মোসাম্মৎ সীমা বেগমের মতো কেউ কেউ সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। কীভাবে ক্ষতি সামলাবেন, সেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে তাঁদের কপালে।

কৃষিতে ছোট-বড় যেকোনো ক্ষতিরই ভাগ নিতে হয় মর্জিনা বেগম, সীমা বেগম, বিজলি আক্তারদের। তবে আয়ের ভাগ বা মজুরি তাঁরা পুরুষের সমান পান না।

১৭ ও ১৮ জুন চুকাইবাড়ীর বালুগ্রাম দক্ষিণ ও যমুনার চর এলাকায় গিয়ে কথা হয় অন্তত ১৫ জন কৃষিজীবী নারীর সঙ্গে। তাঁরা সবাই পুরুষের চেয়ে প্রায় অর্ধেক মজুরি পান। কেউ কেউ পারিবারিক জমিতে নিয়মিত খাটেন, অথচ লাভের অর্থ পান না। কারও কিছু জমির মালিকানা থাকলেও ফসল উৎপাদন, বিক্রি বা আয়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। আবার জমির দলিল না থাকায় কৃষিঋণ ও বিনা মূল্যের কৃষি উপকরণও পান না তাঁরা। সস্তা শ্রম আর অধিকার বঞ্চনার এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কৃষিতে নারীর উপস্থিতি বাড়ছে, বিপরীতে কমছে পুরুষের সংখ্যা।

আরও পড়ুনকৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, সেবা ও শিল্পে কমেছে ০৯ মার্চ ২০২৫কৃষিজীবী নারী বাড়ছে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ (২০২২) অনুসারে, প্রধান অর্থনৈতিক খাত হিসেবে কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ৪৫ শতাংশ জনবল (১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা) নিয়োজিত। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ নারী, ১৯ শতাংশ পুরুষ। সংখ্যার হিসাবে কৃষি খাতে অর্থাৎ কৃষি, বনায়ন ও মৎস্যকর্মী হিসেবে নিয়োজিত ৩ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার জন। নারী শ্রমশক্তির মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজ, বনজ ও মৎস্যকর্মী হিসেবে নিয়োজিত। শহরের চেয়ে গ্রামে নারী ও পুরুষের কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকার হার ১০ শতাংশ বেশি।

২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় নারীদের ৬০ শতাংশ ও পুরুষদের ৩২ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত ছিলেন।

কৃষিকাজ বলতে এখন বোঝানো হয় শস্য উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ ও বনায়ন বা বাড়ির আশপাশে গাছ লাগানো ইত্যাদি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ইসমত আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অকৃষি কাজে পুরুষের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষিকাজে মজুরি ও সামাজিক মর্যাদা কম—এমন মনোভাব থেকে বাড়ির পুরুষেরা শহরে পড়াশোনা ও চাকরির জন্য এবং বিদেশে শ্রমিক হিসেবে চলে যাচ্ছেন। ফলে গ্রামে কৃষির দেখভালের দায়িত্ব পড়ছে নারীর ওপর। নারীরাই কৃষি টিকিয়ে রাখছেন। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষি।

শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুসারে, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষির হার (সরকারি ও বেসরকারি সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায়) ১ শতাংশের কিছু বেশি, অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ৪৪ শতাংশ। আর নারীদের প্রায় ৯৭ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষিতে যুক্ত। এ ক্ষেত্রে পুরুষের হার ৭৮ শতাংশ।

সস্তা শ্রম আর অধিকার বঞ্চনার মধ্যেও কৃষিতে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ.

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: শ রমশক ত

এছাড়াও পড়ুন:

বাংলাদেশ একটি ‘দুষ্টচক্রের ত্রিভুজে’ আটকে ছিল: হোসেন জিল্লুর রহমান

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি ‘দুষ্টচক্রের ত্রিভুজে’ আটকে ছিল। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি; সমতা ছিল নীতিনির্ধারকদের নজরের বাইরে; আর শাসনব্যবস্থা জড়িয়ে পড়েছিল দুর্নীতি ও ক্ষমতাশালী ধনী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে। তিনি বলেন, ২০২২ সালের পর একের পর এক সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে দেশ আজ এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।

আজ রোববার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন হোসেন জিল্লুর রহমান।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও প্রকৃত জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, মানুষকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে নতুন ধরনের সামাজিক চুক্তি গড়ে তোলা।

‘বিয়ন্ড জবলেস গ্রোথ: টুওয়ার্ডস অ্যান এমপ্লয়মেন্ট-সেন্টারড পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ থ্রো আ পোস্ট-নিওলিবারাল লেন্স’ (বাংলাদেশে বেকারত্বহীন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক নীতি কাঠামো) শীর্ষক এ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও জার্মান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রেডরিক এবার্ট স্টিফটাং (এফইএস) এ আয়োজন করে।

শ্রম ও কর্মসংস্থানসচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সহ–উপাচার্য সায়মা হক।

পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘সহনশীল রাষ্ট্র’ বা রেজিলিয়েন্ট অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখা হয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে দেশ এখন ‘আনন্দহীন রেজিলিয়েন্সের ফাঁদে’ আটকে গেছে। অর্থাৎ সহনশীলতা আমাদের শক্তি হলেও বর্তমানে তা আর আনন্দ দিচ্ছে না। সংকট মোকাবিলার চক্র থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য সায়মা হক বিদিশা বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন নেই। কৃষক পরিবারের সন্তানেরা এখন কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে না। এ জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং ও অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য ছোট নীতি ও প্রণোদনা দেওয়া হলে সেটি বড় ধরনের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনতে পারে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয় তার সঙ্গে চাকরি তৈরি করার সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে প্রতিবছরে উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। কিন্তু উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৫ লাখের মতো। কাজেই প্রবৃদ্ধি হলেই কর্মসংস্থান হবে, এই ধারণা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে চাকরি তৈরি হবে, এমন জিনিসকে কেন্দ্র করে আমাদের সব নীতি সাজাতে হবে।’

কলেজগুলো বেকার তৈরির কারখানা

প্যানেল আলোচনায় বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, ১৫ বছর আগে দেশে তিন লাখের মতো গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতো। সেখানে এখন প্রতিবছর সাড়ে ৪ লাখের বেশি গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এর ৭০ শতাংশই আসে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে। এই কলেজগুলো বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।

প্রবাসী শ্রম রপ্তানিতে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের কথাও তুলে ধরেন ফাহিম মাসরুর। তিনি বলেন, প্রতিবছর ১২ লাখ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের ৯০-৯৫ শতাংশই ম্যাট্রিক-পাস।

আমাদের বরং সাড়ে চার লাখ গ্র্যাজুয়েট থেকে অন্তত এক লাখ দক্ষ মানুষ বিদেশে পাঠানো উচিত ছিল। এ অবস্থায় নিম্ন দক্ষতার শ্রমিক রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রের কারণে কর্মসংস্থানের হার কমছে। শ্রমিকদের পুনঃ প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কোনো অধিদপ্তর নেই। এটি দেশে কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • বাংলাদেশ একটি ‘দুষ্টচক্রের ত্রিভুজে’ আটকে ছিল: হোসেন জিল্লুর রহমান