বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে গরুর খামার, বছরে আয় ১১ লাখ টাকা
Published: 7th, July 2025 GMT
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির পেছনে নয়, তিনি হাঁটলেন উল্টো পথে। ফিরলেন গ্রামের মাটিতে। গড়ে তুললেন গরুর খামার। এখন এই খামার থেকেই তাঁর বছরে আয় ১১ লাখ টাকার বেশি। শুধু দুধ বিক্রি করেই মাসে আয় করছেন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
গল্পটা মোহাম্মদ ফয়সালের। তাঁর বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম কোনাখালী বাজারপাড়া গ্রামে। বাবা মোহাম্মদ রশিদ পেশায় কৃষক। চার ভাইবোনের মধ্যে ফয়সাল তৃতীয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে ২০২১ সালে স্নাতক ও ২০২২ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন তিনি। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই গ্রামে গড়ে তোলেন খামার। দুটি গাভি দিয়ে শুরু করা তাঁর খামারে এখন গরু রয়েছে ২০টি। এসব পরিচালনার জন্য রয়েছেন তিনজন কর্মচারী।
প্রতিদিন গাভিগুলো থেকে ৯০ থেকে ১০০ লিটার দুধ সংগ্রহ করি। নিয়মিত পেকুয়া ও বদরখালী বাজারে এই দুধ বিক্রি করি। আমার উদ্দেশ্য বাজারে দুধ বা পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা, মাংসের নয়। অনেকে মাংসের জন্য খামার করেন। আমি করি দুধের জন্য।মোহাম্মদ ফয়সাল, খামারিচকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা বাজারপাড়া গ্রামের ইট বিছানো সড়ক দিয়ে ৩০০ ফুট দক্ষিণে গেলেই ফয়সালের বসতঘর। গত শুক্রবার সরেজমিন দেখা যায়, বাড়ির উঠানেই তৈরি করেছেন ৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের ও ১৮ ফুট প্রস্থের একটি ছাউনি। এতে রাখা ১১টি গাভি। আর বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে রেখেছেন ৯টি বাছুর। ফয়সাল তখন গাভিকে কাঁচা ঘাস দিতে ব্যস্ত। পাশেই এক কর্মচারী দুধ দোহন করছিলেন। আরেক কর্মচারী ঘাস কেটে ছাউনিতে আনছেন।
কাজ করার এক ফাঁকে ফয়সাল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময়ই তিন বন্ধু মিলে অনলাইনে গাছের চারা বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ওই ব্যবসা দিয়েই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। সেই থেকে চাকরি না করে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন জাগে তাঁর। এরপর পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গাভি ও বকনা কিনে যাত্রা শুরু করেন ‘ফয়সাল অ্যাগ্রো ফার্ম’ নামের খামারের। বেসরকারি একটি সংস্থা থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে খামারের ছাউনি নির্মাণ এবং ঘাসের জন্য ১৬০ শতাংশ জমি বর্গা নেন।
ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিদিন গাভিগুলো থেকে ৯০ থেকে ১০০ লিটার দুধ সংগ্রহ করি। নিয়মিত পেকুয়া ও বদরখালী বাজারে এই দুধ বিক্রি করি। আমার উদ্দেশ্য বাজারে দুধ বা পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা, মাংসের নয়। অনেকে মাংসের জন্য খামার করেন। আমি করি দুধের জন্য।’
দুটো গাভি দিয়ে খামার শুরু করেন ফয়সাল। এখন তাঁর খামারে গরু রয়েছে ২০টি.উৎস: Prothomalo
এছাড়াও পড়ুন:
শেখ হাসিনার বিচার: ন্যায়বিচার বনাম ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন
শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে কি ন্যায়বিচার হয়েছে? আদালতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মুহূর্তে যখন উল্লাস ধ্বনিতে পরিবেশ ভরে উঠল, তখনই বোঝা গেল—আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা, অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের জন্য ন্যায়বিচার মানে ঠিক এই রায়ই। তাঁদের কাছে হাসিনার দোষ প্রমাণ করার মতো কোনো বিচার প্রক্রিয়া জরুরি ছিল না। কারণ বিচার শুরু হওয়ার অনেক আগেই তাঁরা বিশ্বাস করতেন, হাসিনা দোষী।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে টানা তিন সপ্তাহ দেশের বড় বড় শহরে ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে কখনো নির্বিচারে, কখনো নিশানা করে হত্যা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। অনেক সময় শাসক দলের কর্মীরাও তাঁদের সঙ্গে এতে অংশ নিয়ে গুলি চালিয়েছিল। এই সংগঠিত হত্যাযজ্ঞ, যার ভেতর অনেক ঘটনা ভিডিওতেও ধরা পড়েছে, আন্দোলনকারীদের চোখে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল, এ ধরনের মারাত্মক হামলার নির্দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এসেছে।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা, প্রত্যক্ষদর্শী, আন্দোলনকারীরা এবং তাঁদের সমর্থকদের কাছে বিচার মানে হাসিনা দোষী কি নির্দোষ, তা নির্ধারণ ছিল না। তাঁদের কাছে বিচার ছিল তাঁর প্রাপ্য শাস্তি বুঝিয়ে দেওয়া। তাঁদের দৃষ্টিতে হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো রায় দেওয়া হলে সেটিকে ‘ন্যায়বিচার’ বলা যেত না।
এক পরিচিত ধারাএই ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে যখন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাঁদের অনেককে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়, তখনো একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল।
গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী ও অন্যান্য জামায়াত নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করা হলে ‘মুক্তিযুদ্ধপন্থী’ গোষ্ঠীগুলো উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিল। তাঁদের কাছে তাঁরা ছিলেন এমন মানুষ, যাঁরা অতীতে জবাবদিহি এড়িয়ে গিয়েছিলেন এবং আল-বদর বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাশালী অবস্থানে উঠতে পেরেছিলেন। আল-বদর ছিল জামায়াতের ছাত্র সংগঠন থেকে গঠিত একটি আধাসামরিক বাহিনী। এই সংগঠনের বিরুদ্ধে বহু নৃশংসতার অভিযোগ ছিল।
অনেকেই এখন যেমন শেখ হাসিনাকে সন্দেহাতীত দোষী মনে করেন, ঠিক তেমনই ‘মুক্তিযুদ্ধপন্থী’ সমর্থকেরা তখন জামায়াত নেতাদের অপরাধকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট বলে ধরে নিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে এসব বিচার ছিল মূলত যোগ্য শাস্তি কার্যকর করার একটি মাধ্যম মাত্র।
দুই সময়েই (তৎকালীন জামায়াত নেতাদের বিচার হোক বা এখনকার শেখ হাসিনার বিচার) বিচারপ্রক্রিয়া কতটা যথাযথ হলো, তা এসব গোষ্ঠীর কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। শুধু আইনি কাঠামো আছে—এইটুকুই যেন যথেষ্ট। বিচার কতটা ন্যায়সংগত হচ্ছে, বা সঠিক প্রক্রিয়া মেনে বিচার হয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন তুললেই যেন অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়ানো হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানে হলো, ‘প্রাপ্য বিচার’ থেকে তাঁদের বাঁচানোর চেষ্টা।
আরও পড়ুনহাসিনার বিচার: ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়’ ও তথ্যপ্রমাণ২৩ নভেম্বর ২০২৫‘ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার’ ও ‘ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া’—দুই বিষয়কে আলাদা করাএখনকার কিংবা ২০১৩ সালের জনপ্রিয় ‘ন্যায়বিচার’ ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। এখানে মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার’ কথাটি যেন ‘ন্যায়সংগত বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ থেকে আলাদা করে দেখা হয়।
এই দুই বিষয়কে আলাদা না করার সমস্যাটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিতে। সেখানে তারা শেখ হাসিনার দণ্ড নিয়ে মন্তব্য করেছে। তারা দাবি করেছে, তারা জানে আসলে কোনটি ‘ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার।’ তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তির শিরোনাম ছিল: ‘শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে ২০২৪ সালের গণহত্যার ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি।’
কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই বিশ্বাস করেন—ন্যায়বিচার হয়েছে। অ্যামনেস্টি আরও বলেছে: ‘বেঁচে থাকা ও নিহত ব্যক্তিদের জন্য প্রকৃত ন্যায়বিচার হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান পূরণ করবে।’
এ কথাগুলো ভুক্তভোগীদের অবস্থানকে ঠিকভাবে প্রকাশ করে না। তারা এমন কোনো বিচারপ্রক্রিয়া চাইছে না। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছিল: ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ের ভুক্তভোগীরা এর চেয়েও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।’ কিন্তু ভুক্তভোগীরা নিজেরা তো এমন কথা বলছেন না।
আরও পড়ুনশেখ হাসিনার বিচার: আসামিপক্ষের দুর্বল আইনি সহায়তা ও ত্রুটিপূর্ণ বিচারিক যুক্তি১৯ নভেম্বর ২০২৫আর যদি অ্যামনেস্টি ২০১৩ সালের বিচারের ক্ষেত্রেও একই দাবি করত, সেখানেও তারা ভুলই করত। তবে এর মানে এই নয় যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা ভুল।
আদালতে ‘স্বাধীনতার অভাব’ ছিল—এমন দাবি করার জন্য যথেষ্ট জোরালো যুক্তি রয়েছে। যদি না থাকত, তবে এত বড় এবং জটিল একটি মামলার ক্ষেত্রে আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং রায় ঘোষণার এই ‘নজিরবিহীন দ্রুততা’ ‘ন্যায্য বিচার সংক্রান্ত উদ্বেগ’ সৃষ্টি করত না। উপরন্তু, আদালতের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা আসামি পক্ষের আইনজীবীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যে ‘সময় দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত’।
আর, এই ‘অন্যায্য বিচারের সূচকগুলো’ আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন এই মর্মে খবর পাওয়া যায় যে, ‘আসামি পক্ষের আইনজীবীকে পরস্পর-বিরোধী বলে গণ্য হওয়া সাক্ষ্যের জেরা করার অনুমতিই দেওয়া হয়নি’ বলে জানা গিয়েছে। অ্যামনেস্টি যথার্থই বলেছে যে এর ফলে বিষয়টা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
এগুলো খুব গুরুতর বিষয়। তবে এগুলো বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত, ভুক্তভোগীদের চোখে ‘ন্যায়বিচার’ পাওয়ার সঙ্গে নয়। অ্যামনেস্টি এই দুইটিকে গুলিয়ে ফেলেছে।
জাতিসংঘ আবার এই দুটি বিষয় মিলিয়ে ফেলেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেছেন যে হাসিনার ও অন্যান্যদের রায় ‘গত বছর প্রতিবাদ দমন করতে মারাত্মক যেসব অপরাধ ঘটেছে, তাঁর ভুক্তভোগীদের জন্য অনেক বড় বিষয়।’
এরপর তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার মান নিয়ে এ কথা যোগ করেন: ‘আমরা অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি সব সময় একইভাবে বলে এসেছি-বিশেষত যেসব বিষয় আন্তর্জাতিক অপরাধ শ্রেণিতে পড়ে সেসব ক্ষেত্রে। আমরা সব সময় যা সমর্থন করেছি তা হলো বিচার যেন সঠিক প্রক্রিয়া এবং ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো প্রশ্নাতীতভাবে মেনে চলে।’
‘বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়েছে? সে বিষয়ে অজ্ঞ থাকার জন্য জাতিসংঘের সমালোচনা নিশ্চয়ই করা যায়। সঠিক প্রক্রিয়ার মানদণ্ড বিষয়ে জাতিসংঘ কেন আরও সমালোচনা করেনি সে বিষয়েও এর সমালোচনা করা যায়। কিন্তু জাতিসংঘ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তফাত ধরতে পেরেছে। তা হলো অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষের চোখে ‘সুবিচার’ এবং ‘ন্যায্য মানদণ্ডের’ মধ্যে পার্থক্য। দুটো এক বিষয় না।
বাংলাদেশ আসলে কেমন রাষ্ট্র হতে চায় আর এর বিচারব্যবস্থাকে কেমন দেখতে চায় তাঁর সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নটি জড়িত। সরকার মনে করেছে, ‘ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে গেলে পুরোপুরি আইনানুগ ও নিরপেক্ষ বিচার করলে সেটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, বা অন্তত বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই দ্বিধার মুখে সরকার স্পষ্টভাবেই ভুক্তভোগীদের ‘ন্যায়বিচার’ (অর্থাৎ আসামির জন্য কঠোর শাস্তি)-কেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার বনাম ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়াবাংলাদেশ আসলে কেমন রাষ্ট্র হতে চায় আর এর বিচারব্যবস্থাকে কেমন দেখতে চায় তাঁর সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নটি জড়িত। সরকার মনে করেছে, ‘ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে গেলে পুরোপুরি আইনানুগ ও নিরপেক্ষ বিচার করলে সেটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, বা অন্তত বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই দ্বিধার মুখে সরকার স্পষ্টভাবেই ভুক্তভোগীদের ‘ন্যায়বিচার’ (অর্থাৎ আসামির জন্য কঠোর শাস্তি)-কেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এখানে এক ধরনের ‘ট্রেড অফ’ বা এক জিনিস পাওয়ার জন্য অন্য জিনিস ছাড় দেওয়ার মতো আপস বিনিময় হয়েছে। হ্যাঁ, আদালতের রায় বাংলাদেশের ভেতরে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে, অনেকের কাছে এটি ‘ন্যায়বিচার’ হিসেবে গ্রহণযোগ্যও হয়েছে। কিন্তু যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া মানা না মানারও খারাপ দিক আছে।
এই ক্ষতিগুলো কী? প্রথমত, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে এ ক্ষেত্রে খুব সীমিত সমর্থন মিলবে। এ ধরনের বিচারকে তারা পুরোপুরি সমর্থন করবে না। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ পাওয়ার সম্ভাবনা এখন শূন্য। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের মধ্যে যাঁরা এই বিচারকে ‘অবৈধ’ বা ‘রাজনৈতিক’ বলতে চাইছে, এতে তাদের যুক্তি আরও শক্তিশালী হলো এবং এখানে আন্তর্জাতিক অপরাধসহ বড় মামলায়ও ন্যায়সংগত বিচার হয় না বলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আছে, এই রায়ে সেটি আরও পোক্ত হলো।
আরও পড়ুনহাসিনার সাজার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী২১ নভেম্বর ২০২৫অনেকে বলবেন, এই তুলনা ঠিক নয়। কারণ ২০২৪ সালের আন্দোলন সংক্রান্ত হাসিনার বিচারটি নতুন সংশোধিত আইনের আওতায় হয়েছে এবং সেখানে আগের আইনের তুলনায় অপরাধ নির্ধারণ হয়েছে আরও বিস্তারিত উপায়ে আর তাঁর মাপকাঠিও আগের চেয়ে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, যা সুষ্ঠু বিচারের জন্য আবশ্যক। এ ছাড়া, এই বিচারে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ—যেমন গোপনে সংগ্রহ করা ফোনালাপের অডিও রেকর্ডিং, ভিডিও ফুটেজ, এবং একজন ‘অ্যাপ্রুভার’-এর জবানবন্দি—১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী বিচারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এটিও সত্য।
তবে দুই ধরনের বিচারই খুবই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত পরিবেশে হয়েছে এবং উভয় ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতার দিক থেকে কম দক্ষ এবং এই দাবি সম্ভবত করা যেতে পারে যে পক্ষপাতদুষ্ট বিচারকদের নিয়োগ ছিল। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৪ সালে এসে হাসিনার বিচারের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত আসামির বিচার (ইন অ্যাবসেনশিয়া ট্রায়াল) করার নিয়মকানুনে ২০১৩ সালের তুলনায় কোনো উন্নয়ন হয়নি।
ফলে, আগের বিচারগুলোর ক্ষেত্রে যেসব সমালোচনা হয়েছিল, এই বিচারও তাঁর কিছু সমালোচনার মুখে পড়বে।
ভবিষ্যতে আরও বিচার চলার সময়, সরকার ও আদালতকে বারবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করায় কতটা গুরুত্ব দিতে হবে, আর পুরোপুরি ন্যায্য ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করায় কতটা গুরুত্ব দিতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বা সমঝোতা করাই তাদের সিদ্ধান্তের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
ডেভিড বার্গম্যান সাংবাদিক। ফেসবুক: david.bergman.77377
*মতামত লেখকের নিজস্ব