‘জুলাই ঘোষণাপত্রকে’ সংবিধানের মূল নীতিতে স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপের নিন্দা রিজভীর
Published: 11th, July 2025 GMT
সংবিধানের মূল নীতি হিসেবে জুলাই ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বানকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি ইতিমধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্রের অনেক বিষয় মেনে নিয়েছে। কিন্তু কেন এটিকে সংবিধানের মৌলিক নীতির অংশ করা হবে?’
আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জায়নামাজ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সংস্কার সারা দেশে এবং সব সময় অব্যাহত থাকবে। সংস্কার কোনো পর্বতমালার মতো স্থির কিছু নয়। এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, রাষ্ট্র বা জনগণের স্বার্থে যখন প্রয়োজন হয়, তখন সংস্কার করা উচিত এবং উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা উচিত।
রিজভী বলেন, ‘এটাই একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সংস্কার আগে করতে হবে এবং এটি (জুলাই ঘোষণাপত্র) সংবিধানের মৌলিক নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, এই দাবি বিভ্রান্তিকর। এটি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। কেন আপনারা এভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন?’
বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পরিবর্তে জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান রুহুল কবির রিজভী।
রিজভী বলেন, ‘স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা ১৬ বছর ধরে গণতন্ত্রের দরজা বন্ধ করে জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। আমাদের এখন সেই বন্ধ দরজা আবার খুলতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠন করে জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে।’
বিএনপি কখনো সংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলেনি এবং বাস্তবে সর্বদা এটিকে সমর্থন করেছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘আপনি সংস্কারের নামে যে বিষয়গুলোর কথা বলছেন, তার অনেকগুলো ইতিমধ্যেই বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।’
রিজভী বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে একটি বৃহত্তর আদর্শের জন্য লড়াই করে আসছে—ন্যায়বিচার, সাম্য, আইনের শাসন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র। ‘এই লড়াই রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা পুনরুদ্ধারের জন্য। যখন সেই মালিকানা অস্বীকার করা হয়, তখন এটি ফ্যাসিবাদের পথ খুলে দেয়।’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘জনগণের সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সেই জবাবদিহি এখন নেই। আমরা বিশ্বাস করি যে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সমর্থন এবং সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে গঠিত হয়েছে— আওয়ামী লীগ ও তার কয়েকটি মিত্র ছাড়া।’
রিজভী বলেন, ‘আমরা সবাই ড.
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। মানুষ যদি খাবার কিনে খেতে না পারে, তাহলে এটি দুর্ভিক্ষের স্পষ্ট লক্ষণ। যদি এ ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না—তখন পতিত ফ্যাসিস্টরা আনন্দে হাততালি দেবে।
রিজভী বলেন, সরকার চাইলে আওয়ামী লীগের যেসব সহযোগী দেশ ছেড়ে বিপুল অর্থ পাচার করে পালিয়ে গেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া বন্ধ করতে পারে।
‘অর্থনীতির ভয়াবহ অবস্থার কারণে কারখানা বন্ধ করা উচিত নয়। এটি কেবল একটি বক্তব্যই নয়, মানুষ এখন গুরুত্বসহকারে ভাবছে যে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে দেশ দুর্ভিক্ষে পতিত হয় কি না,’ সতর্ক করেন রিজভী।
উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: ব ভ র ন ত কর জনগণ র ক র জন য সরক র ব এনপ
এছাড়াও পড়ুন:
২০ লাখ ভোটকর্মীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে একটি প্রস্তাব
লেখাটি ছোট। প্রস্তাবও সহজ। কিন্তু ব্যাপ্তি অনেক। এ দাবি মানা উচিত, মানতে হবে! বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের বেশির ভাগই ভোট দিতে পারেন না। এটি গণতন্ত্রের এক চাক্ষুষ বৈষম্য। এ বৈষম্য রোধ করতে রাষ্ট্রকে সহজ পথ খুঁজে বের করতে হবে।
সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটু পেছনে ফিরলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তখন দেশে ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র ছিল। ৬৬ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৫৯২ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৪২ হাজার ১৪৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ওই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন।
একটি কেন্দ্রে একাধিক বুথ বা ভোটকক্ষ থাকে। দ্বাদশ নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। প্রতিটি ভোটকক্ষের দায়িত্বে থাকেন একজন করে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। সুতরাং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাও ছিল ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। প্রতি কক্ষে দুজন করে পোলিং এজেন্ট ছিলেন, সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। এ হিসাবে দ্বাদশ নির্বাচনে শুধু ব্যালটের সঙ্গে যুক্ত ভোটকর্মীই ছিলেন ৮ লাখের বেশি। আসন্ন নির্বাচনেও এ সংখ্যা প্রায় এমনই থাকবে।
এর বাইরে সাধারণত প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার মিলে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন প্রায় ১৬ জন। এ হিসাবে মোট ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা সাত লাখের মতো। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে এ সংখ্যা আরও বেশি হয়। এ ছাড়া রিজার্ভ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাসদস্যরা রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন স্তরে ২০ লাখের মতো মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
নিজ শহর ছেড়ে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করা গণমাধ্যমকর্মীদের সংখ্যা অনেক। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, থানাসহ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে অনেক। ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও এ মানুষদের অনেকের পক্ষেই ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না। অথচ এ মানুষগুলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ অংশীদার। এ মানুষগুলো তাঁদের কর্মের কারণে দেশের ভালো–মন্দের বিষয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন। সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্ট সাধারণত শিক্ষকদের মধ্য থেকে হয়ে থাকেন। এ মানুষগুলো রাষ্ট্রের নাগরিক গড়ার মূল কারিগর। অথচ তাঁরা নির্বাচনে তাঁদের রায় দিতে পারেন না।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এ ভোটকর্মীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু তা অত্যন্ত জটিল। নির্বাচনী প্রজ্ঞাপন জারির ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর সংশ্লিষ্ট ভোটারকে আবেদন করতে হয়। এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তা ওই ভোটারের ঠিকানা বরাবর ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠাবেন। সেটি আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করে আরেকজন ব্যক্তির দ্বারা সত্যায়ন করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পাঠাতে হবে। এই পদ্ধতি পড়তে গেলেই মাথা ঝিম করে ওঠে। এ ঝক্কি পেরিয়ে কয়জনের পক্ষে এ পোস্টাল ভোট দেওয়া সম্ভব?
কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন ১০ জন শিক্ষককের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। তাঁদের কেউই তাঁদের পোস্টাল ভোটিং সম্পর্কে অবগত নন। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কাজ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা জানালেন, ভোটকর্মীদের পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়টি মোটাদাগে নির্বাচনী নথি ও আরপিওর ভেতরই সীমাবদ্ধ, জনপরিসরে চর্চিত নয়।
সহজ প্রস্তাবরিটার্নিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আনসার পর্যন্ত সব ধরনের ভোটকর্মীর ভোটাধিকার সহজ করা হোক। এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হলো, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্ক্যান করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়া। এর জন্য একবার ব্যবহারযোগ্য টেমপ্লেট ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে নির্বাচন কমিশন। কারণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কল্যাণে ব্যক্তির আঙুলের ছাপ তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, স্মার্ট কার্ডধারীদের আইরিশও আছে। আর এই ডিভাইসগুলোও পর্যাপ্ত আছে বলে মনে করি। এনআইডি স্ক্যানের পর ক্রস চেকের জন্য শুধু আঙুলের ছাপ নিতে চাইলে সিম বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নির্বাচনের দিনের জন্য কিছু বায়োমেট্রিক মেশিনও ধার নিতে পারে কমিশন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একটি মেশিন সেটআপের বেশি প্রয়োজন হবে না।
মনে রাখতে হবে, এই যে কমবেশি ২০ লাখ ভোটকর্মীর ধারণা দেওয়া হলো, তাঁরা সবাই কিন্তু রাষ্ট্রে সচেতন শ্রেণির নাগরিক, শিক্ষিত শ্রেণির নাগরিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাই এই মানুষগুলোর নির্বাচনী রায় অনেকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তাঁরা একজন প্রার্থীকে বা একটি দলকে অনেক কিছুর ওপর ভিত্তি করে রায় দেবেন। তাঁদের পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতালের মতো জরুরি সেবা-পরিষেবামূলক খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও এনআইডি স্ক্যান করে কর্মস্থলের পাশের কোনো কেন্দ্রে ভোটাধিকার দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। এটা একটি নাগরিক অধিকার বলে মনে করি।
মো. ছানাউল্লাহ প্রথম আলোর সহসম্পাদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব