ভারত কেন ৮ কোটি মানুষের ভোটাধিকার যাচাই করছে?
Published: 11th, July 2025 GMT
ভারতে এবার প্রায় ৮ কোটিরও বেশি ভোটারের নথি পুনরায় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। দেশ থেকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বিতাড়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। নথি দাখিলের মাধ্যমে তাদের পরিচয় নতুন করে প্রমাণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে এই ৮ কোটি মানুষকে ভোটবঞ্চিত করার এবং দেশ থেকে বের করে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বিশ্বের কথিত বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশটিতে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এই উদ্যোগ দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত ২৪ জুন ইসিআই ঘোষণা দেয়, বিহার রাজ্যে ৮ কোটির কাছাকাছি সব ভোটারকেই আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন করে ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধন করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে তারা ভোটাধিকার হারাবেন এবং ইসিআইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের ‘সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এমনকি তাদের জেল বা দেশ থেকে বহিষ্কারাদেশের মুখেও পড়তে হতে পারে। আগামী অক্টোবর বা নভেম্বরে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
এই পদক্ষেপকে অনেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিতর্কিত জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনকে (এনআরসি) পেছনের দরজা দিয়ে বাস্তবায়নের কৌশল হিসেবে দেখছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার অতীতে ‘অবৈধ অভিবাসী’ শনাক্ত ও বহিষ্কারের অজুহাতে এনআরসি চালুর প্রস্তাব দিয়েছিল।
বিতর্কটা কী নিয়ে?
মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহার। এখানকার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। তবে তৃতীয় বৃহত্তম জনবহুল হওয়ায় রাজ্যটি রাজনৈতিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সাল থেকে রাজ্যটিতে বিজেপি ও আঞ্চলিক জনতা দলের (ইউনাইটেড) জোট বেশির ভাগ সময় ক্ষমতায় রয়েছে।
বিরোধী রাজনীতিবিদ ও নাগরিক গোষ্ঠীগুলো বলছে, এই অল্প সময়ে এত বিশালসংখ্যক মানুষের নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিল সম্ভব নয়। ফলে বহু বৈধ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং তাদের বিহার মিত্র রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) রোববার বিহারে বন্ধের ডাক দিয়েছে। পাশাপাশি তারা সুপ্রিম কোর্টে এই উদ্যোগ বাতিলের আবেদন জানিয়েছেন।
ক্ষমতাসীন দল বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম অভিবাসী ভারতে ঢুকছে বলে দাবি করে আসছে। দলটি চাচ্ছে, দেশজুড়ে একইভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হোক।
নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা কী?
২৪ জুনের আদেশে ইসিআই বলেছে, ‘কোনো অযোগ্য ব্যক্তি যেন ভোটার তালিকায় না থাকে’ তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। দ্রুত নগরায়ণ, অভিবাসন, নতুন ভোটার, মৃত ভোটার এবং বিদেশি অবৈধ অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলো এই পদক্ষেপের পেছনে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এর আগে ২০০৩ সালে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা সংশোধন হয়েছিল। এর পর থেকে নিয়মিতই তালিকা হালনাগাদ হয়েছে, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগেও তা করা হয়েছিল। ইসিআই জানিয়েছে, যারা ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় ছিলেন, তাদের শুধু পুনরায় ফরম জমা দিলেই চলবে। তবে ২০০৩ সালের পর যারা তালিকায় যুক্ত হয়েছেন, তাদের বয়স ও জন্মস্থান প্রমাণের জন্য নথিপত্র, এমনকি বাবা-মায়ের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে।
ইসিআইয়ের হিসাবে, প্রায় ৮ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি নাগরিককে যাচাই করতে হবে। কিন্তু স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ইসিআইয়ের কর্মকর্তারা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের একটি ফরম দেবেন। এরপর ভোটারদের সেই ফরমে প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে। ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এই কাজ শেষ করতে হবে। ১ আগস্ট খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং বাদ পড়া ব্যক্তিদের আপত্তি জানানোর জন্য আরও এক মাস সময় দেওয়া হবে।
ভারতীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের প্রতিষ্ঠাতা জগদীপ চোকার বলেন, ২০০৩ সালের পর যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখায় এই পদক্ষেপ। তাহলে কি ইসিআই বলছে, বিহারে ২০০৩ সালের পর যত নির্বাচন হয়েছে, সবই প্রশ্নবিদ্ধ?
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, লাখ লাখ বৈধ ভোটার নথি দেখাতে না পারায় ভোটাধিকার হারাতে পারেন। এতে ভারতের গণতন্ত্র বড়সড় এক সংকটে পড়বে বলেই মনে করছেন তারা। এ নিয়ে জগদীপ চোকারের সংস্থাই প্রথম এই উদ্যোগ বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। তিনি বলেন, এর ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। এভাবে চললে রাজ্যের অর্ধেক মানুষের ভোটাধিকারই বাতিল হয়ে যেতে পারে।
উৎস: Samakal
কীওয়ার্ড: ২০০৩ স ল র
এছাড়াও পড়ুন:
২০ লাখ ভোটকর্মীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে একটি প্রস্তাব
লেখাটি ছোট। প্রস্তাবও সহজ। কিন্তু ব্যাপ্তি অনেক। এ দাবি মানা উচিত, মানতে হবে! বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের বেশির ভাগই ভোট দিতে পারেন না। এটি গণতন্ত্রের এক চাক্ষুষ বৈষম্য। এ বৈষম্য রোধ করতে রাষ্ট্রকে সহজ পথ খুঁজে বের করতে হবে।
সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটু পেছনে ফিরলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তখন দেশে ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র ছিল। ৬৬ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৫৯২ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৪২ হাজার ১৪৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ওই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন।
একটি কেন্দ্রে একাধিক বুথ বা ভোটকক্ষ থাকে। দ্বাদশ নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। প্রতিটি ভোটকক্ষের দায়িত্বে থাকেন একজন করে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। সুতরাং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাও ছিল ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। প্রতি কক্ষে দুজন করে পোলিং এজেন্ট ছিলেন, সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। এ হিসাবে দ্বাদশ নির্বাচনে শুধু ব্যালটের সঙ্গে যুক্ত ভোটকর্মীই ছিলেন ৮ লাখের বেশি। আসন্ন নির্বাচনেও এ সংখ্যা প্রায় এমনই থাকবে।
এর বাইরে সাধারণত প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার মিলে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন প্রায় ১৬ জন। এ হিসাবে মোট ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা সাত লাখের মতো। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে এ সংখ্যা আরও বেশি হয়। এ ছাড়া রিজার্ভ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাসদস্যরা রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন স্তরে ২০ লাখের মতো মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
নিজ শহর ছেড়ে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করা গণমাধ্যমকর্মীদের সংখ্যা অনেক। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, থানাসহ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে অনেক। ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও এ মানুষদের অনেকের পক্ষেই ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না। অথচ এ মানুষগুলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ অংশীদার। এ মানুষগুলো তাঁদের কর্মের কারণে দেশের ভালো–মন্দের বিষয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন। সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্ট সাধারণত শিক্ষকদের মধ্য থেকে হয়ে থাকেন। এ মানুষগুলো রাষ্ট্রের নাগরিক গড়ার মূল কারিগর। অথচ তাঁরা নির্বাচনে তাঁদের রায় দিতে পারেন না।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এ ভোটকর্মীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু তা অত্যন্ত জটিল। নির্বাচনী প্রজ্ঞাপন জারির ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর সংশ্লিষ্ট ভোটারকে আবেদন করতে হয়। এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তা ওই ভোটারের ঠিকানা বরাবর ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠাবেন। সেটি আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করে আরেকজন ব্যক্তির দ্বারা সত্যায়ন করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পাঠাতে হবে। এই পদ্ধতি পড়তে গেলেই মাথা ঝিম করে ওঠে। এ ঝক্কি পেরিয়ে কয়জনের পক্ষে এ পোস্টাল ভোট দেওয়া সম্ভব?
কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন ১০ জন শিক্ষককের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। তাঁদের কেউই তাঁদের পোস্টাল ভোটিং সম্পর্কে অবগত নন। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে কাজ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা জানালেন, ভোটকর্মীদের পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়টি মোটাদাগে নির্বাচনী নথি ও আরপিওর ভেতরই সীমাবদ্ধ, জনপরিসরে চর্চিত নয়।
সহজ প্রস্তাবরিটার্নিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আনসার পর্যন্ত সব ধরনের ভোটকর্মীর ভোটাধিকার সহজ করা হোক। এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হলো, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্ক্যান করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়া। এর জন্য একবার ব্যবহারযোগ্য টেমপ্লেট ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে নির্বাচন কমিশন। কারণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কল্যাণে ব্যক্তির আঙুলের ছাপ তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, স্মার্ট কার্ডধারীদের আইরিশও আছে। আর এই ডিভাইসগুলোও পর্যাপ্ত আছে বলে মনে করি। এনআইডি স্ক্যানের পর ক্রস চেকের জন্য শুধু আঙুলের ছাপ নিতে চাইলে সিম বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নির্বাচনের দিনের জন্য কিছু বায়োমেট্রিক মেশিনও ধার নিতে পারে কমিশন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একটি মেশিন সেটআপের বেশি প্রয়োজন হবে না।
মনে রাখতে হবে, এই যে কমবেশি ২০ লাখ ভোটকর্মীর ধারণা দেওয়া হলো, তাঁরা সবাই কিন্তু রাষ্ট্রে সচেতন শ্রেণির নাগরিক, শিক্ষিত শ্রেণির নাগরিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাই এই মানুষগুলোর নির্বাচনী রায় অনেকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তাঁরা একজন প্রার্থীকে বা একটি দলকে অনেক কিছুর ওপর ভিত্তি করে রায় দেবেন। তাঁদের পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতালের মতো জরুরি সেবা-পরিষেবামূলক খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও এনআইডি স্ক্যান করে কর্মস্থলের পাশের কোনো কেন্দ্রে ভোটাধিকার দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। এটা একটি নাগরিক অধিকার বলে মনে করি।
মো. ছানাউল্লাহ প্রথম আলোর সহসম্পাদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব