গাজায় চরম খাদ্যাভাব আর ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার মুখে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। ত্রাণ দেওয়ার কথা বলে ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। শিশুরা মারা যাচ্ছে অভুক্ত থেকে; রোগে ও বিমান হামলায়। হাসপাতালে চিকিৎসক ও ওষুধের তীব্র সংকট। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মারা যাচ্ছেন ধুঁকে ধুঁকে। পুরো উপত্যকা যেন এক বৃহৎ গোরস্তান। এসব ঘটছে অনেকটা প্রকাশ্যে। এ গণহত্যা থামাতে বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগ নেই। উল্টো তারা ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস (ওএইচসিএইচআর) জানিয়েছে, গাজায় ত্রাণ নিতে গিয়ে বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন-জিএইচএফের সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জন নিহত হয়েছেন। গত মে মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘের বারণ সত্ত্বেও মানবাধিকার সংস্থার নামে জিএইচএফ গাজায় তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে এ সংগঠনটি গড়ে তুলেছে।

দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, শুক্রবার জিএইচএফ ত্রাণ নিতে আসা আরও ১০ জনকে হত্যা করেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৬০ জন। এ প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনি শরণার্থী-বিষয়ক জাতিসংঘের প্রধান ফিলিপ লাজ্জারিনি বলেন, ‘গাজায় ইসরায়েল হত্যার সবচেয়ে নির্মম ও দুরভিসন্ধিমূলক পথ বেছে নিয়েছে। উপত্যকা শিশু ও ত্রাণপ্রত্যাশীদের জন্য গোরস্তানে পরিণত হয়েছে।’

ওএইচসিএইচআরের মুখপাত্র রাবিনা শামদাশানি বলেন, ৭ জুলাই পর্যন্ত ৭৯৮ ত্রাণপ্রত্যাশী নিহত হয়েছেন। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডার বলেছে, গাজায় ‘চরম পুষ্টিহীনতা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।’ খান ইউনিসের আল নাসের হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান আহমেদ আল ফারা জানান, ইসরায়েলের বিমান হামলার বৃহস্পতিবার রাতে অন্তত ১৫ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন অনেকে। তাদের হাসপাতালে আনা হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী নেই। এর মধ্যে হাসপাতালের পাশেই থেমে থেমে কামান থেকে গোলা ছুড়ছে ইসরায়েল।

তাঁবু গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল
ব্যাপক হামলায় গাজার প্রায় সব ভবন মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। বাধ্য হয়ে বাসিন্দারা তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। এবার সেখানেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পশ্চিমাঞ্চলের আল মাওয়াসি এলাকাকে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নিরাপদ জোন ঘোষণা করেছিল ইসরায়েল। আলজাজিরা জানায়, গতকাল শুক্রবার সেখানেই হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের সেনারা। তাঁবু গুঁড়িয়ে দিচ্ছে এবং সন্দেহ হলেই হত্যা করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে গৃহহীন অনেককে হতাশ বসে থাকতে দেখা যায়।

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ‘মৃত্যু’, ইঙ্গিত ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর
ইসরায়েলের সাংবাদিক গিডিয়ন লেভি বলেছেন, ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে যে মতবিনিময় হয়েছে, তাতে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের মার্কিন অঙ্গীকার ‘মৃত ও সমাহিত’ বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এক প্রতিবেদক জিজ্ঞাসা করেন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান হবে কিনা? তখন ট্রাম্প বলেন, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের শাসনের ক্ষমতা থাকা উচিত, ইসরায়েলকে হুমকি দেওয়ার নয়। এর অর্থ হলো সামগ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষমতা সর্বদা আমাদের হাতে থাকবে।

লেভি আলজাজিরাকে বলেন, এ মতবিনিময় ছিল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ‘মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা’, যা বাস্তবে ‘অনেক আগেই মারা গেছে’। তিনি বলেন, ‘আমাদের এর মুখোমুখি হতে হবে– কখনও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র থাকবে না। আমাদের সিদ্ধান্ত ও পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে হবে। অর্থাৎ একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিন্তা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ দখলদারিত্ব ও বসতি স্থাপন প্রকল্প অব্যাহত থাকবে, ততক্ষণ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কোনো সম্ভাবনা নেই।’

মার্কিন সুরক্ষায় ইসরায়েলের ‘নিখুঁত অপরাধ’
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারিতে ইসরায়েল ‘নিখুঁত অপরাধ’ করছে। কারণ মার্কিন সমর্থন গাজায় দায়মুক্তির সঙ্গে এ অপরাধ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের পাবলিক পলিসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তামের কারমাউত আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারিতে নিখুঁত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। যেহেতু ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুরক্ষা ও সমর্থন পাচ্ছে, সেহেতু তারা এটি করতে দ্বিধা করছে না। তিনি বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না থাকত, তাহলে আমি বিশ্বাস করি, এ যুদ্ধ অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। দুঃখজনকভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত সু-সমন্বিত যুদ্ধ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র– উভয়ের স্বার্থই একে অপরের সঙ্গে জড়িত।’

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: ইসর য় ল ন হত য ক তর ষ ট র র ইসর য় ল র আম দ র অপর ধ

এছাড়াও পড়ুন:

সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নজরদারিমূলক অভিযান

মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ওপর লক্ষ্য করে নজরদারি, তথ্য চুরি ও অ্যাকাউন্ট দখলের ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা দ্য ইউএস সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি (সাইসা)। সংস্থাটি বলছে, বাণিজ্যিক গুপ্তচর সফটওয়্যার ও রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান ব্যবহার করে দক্ষ সাইবার হামলাকারীরা সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যমে অনুপ্রবেশ করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরো মোবাইল ডিভাইস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে।

সাইসার তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় সামাজিক প্রকৌশল কৌশল, ব্যবহারকারীর অসতর্কতা ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা তিনটিই সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ভুক্তভোগীর অ্যাপে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী ধাপে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রেরণ করা হয়, যার মাধ্যমে ডিভাইসের অভ্যন্তরের তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়।

চলতি বছরের শুরু থেকে এ ধরনের একাধিক অভিযান শনাক্ত হয়েছে। সিগন্যাল অ্যাপের ‘লিংকড ডিভাইস’ সুবিধার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘প্রোস্পাই’ ও ‘টু স্পাই’ নামের দুটি অ্যান্ড্রয়েড স্পাইওয়্যার প্রচারণায় সিগন্যাল ও টোটকের নকল সংস্করণ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। আরেকটি অভিযানে ‘ক্লের‍্যাট’ নামের অ্যান্ড্রয়েড গুপ্তচর সফটওয়্যার ব্যবহার করে রাশিয়ার ব্যবহারকারীদের নিশানা করা হয়। সেখানে টেলিগ্রাম চ্যানেল ও নকল ডাউনলোড সাইট ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টিকটক ও গুগল ফটোজের মতো একই রকম দেখতে ভুয়া অ্যাপ ইনস্টল করিয়ে ডেটা চুরি করা হয়।

একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপের দুটি নিরাপত্তা দুর্বলতার (সি–ভি–ই ২০২৫–৪৩৩০০ ও সি–ভি–ই ২০২৫–৫৫১৭৭) ত্রুটি ব্যবহার করে প্রায় ২০০ জনের কম ব্যবহারকারীকে লক্ষ্য করে আলাদা আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। আবার স্যামসাংয়ের নিরাপত্তা দুর্বলতা (সি–ভি–ই ২০২৫–২১০৪২) কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গ্যালাক্সি ডিভাইসে ‘ল্যান্ডফল’ গুপ্তচর সফটওয়্যার আক্রমণের ঘটনাও সাইসা নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, ডিভাইস লিংক কিউআর কোডের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট দখল, জিরো ক্লিক হামলা ও জনপ্রিয় অ্যাপের নকল সংস্করণ ছড়িয়ে ব্যবহারকারীকে ভুল পথে চালিত করার মতো কৌশল দেখা যাচ্ছে। এসব তৎপরতার মূল লক্ষ্য সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাগরিক সমাজের কর্মী এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

সাইসা বলছে, নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশনযুক্ত মেসেজিং ব্যবহার করা জরুরি। ফিশিং–প্রতিরোধী ‘ফাইডো’ পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবহার করতে হবে এবং মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনে এসএমএস–নির্ভরতা এড়িয়ে চলা উচিত। পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় আলাদা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার উপযোগী।

মোবাইল অপারেটর অ্যাকাউন্টে পিন চালু করা এবং ডিভাইস ও সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখা নিরাপত্তা জোরদার করে। সাইসার মতে, সম্ভব হলে সবশেষ মডেলের ফোন ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত ভিপিএন ব্যবহার না করাই উত্তম। আইফোন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে লকডাউন মোড চালু রাখা, আইক্লাউড প্রাইভেট রিলে সক্রিয় রাখা এবং সংবেদনশীল অ্যাপের অনুমতি সীমিত রাখতে পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এনক্রিপশন সক্রিয় থাকলে তবেই আরসিএস ব্যবহার, গুগল ক্রোমে বাড়তি নিরাপত্তা সুরক্ষা চালু রাখা, গুগল প্লে প্রটেক্ট সচল রাখা ও নিয়মিত অ্যাপের অনুমতি পর্যালোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্র: দ্য হ্যাকার নিউজ

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নজরদারিমূলক অভিযান