আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন, জিনিসপত্রের দাম কীভাবে বেড়েই চলেছে? উদাহরণ দিচ্ছি—
২০২১ সালের জুলাই মাসে এক কেজি ভালো মানের চালের দাম ছিল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। কিন্তু আজ সেই চালের দাম ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা।

এটি শুধু খাবারের ক্ষেত্রেই নয়। বেড়েছে সবকিছুরই দাম। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কী হচ্ছে? দাম কেন বেড়েই চলেছে? দাম কেন একই থাকে না? সব বিক্রেতারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে একসঙ্গে দাম বাড়াচ্ছেন?

আসলে এর পেছনে একটি বড় কারণ আছে। আর সেটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতির এই পরিভাষা এখন অনেকেই জানেন। কিন্তু আমরা কি সত্যিই জানি মূল্যস্ফীতি কেন ঘটে এবং এটি কি সব সময় খারাপ কিছু? আসুন ব্যাখ্যা করি।

মূল্যস্ফীতি কী

মূল্যস্ফীতি আসলে খুবই সহজ একটি বিষয়। মূল্যস্ফীতি তখন ঘটে, যখন সময়ের সঙ্গে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। ফলে টাকার মান কমে যায়। এ জন্যই চাল কিংবা অন্য যেকোনো পণ্য এখন আগের তুলনায় বেশি দামি লাগে। যখন মূল্যস্ফীতি ঘটে, তখন আপনার টাকা আগের মতো জিনিস কিনতে পারে না।

সেই গল্পটা এখানে বলা যায়। আগে মানুষ পকেটভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে ব্যাগভর্তি বাজার আনতেন। এখন ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে পকেটভর্তি বাজার আনতে হয়।

আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৭২ সালে এক কেজি খাসির মাংস পাওয়া যেতে পাঁচ টাকায়। এখন পাঁচ টাকা দিয়ে ছোট্ট একটুকরা হাড্ডিও মিলবে না। অর্থাৎ টাকার মান কমে যাচ্ছে, সবকিছু আগের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল মনে হচ্ছে।

কিন্তু এটা কেন ঘটে?

মূল্যস্ফীতি কেন ঘটে

মুদ্রাস্ফীতি বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে, তবে আমরা সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

১.

চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি বা ডিমান্ড-পুল ইনফ্লেশন

যখন অনেক মানুষ কোনো পণ্য কিনতে চায়, কিন্তু সেই পণ্যের পরিমাণ কম থাকে, তখনই এটি ঘটে। ধরা যাক, সাধারণভাবে মানুষ এক হাজার কেজি চাল কিনতে চান এবং কৃষকেরা ঠিক এক হাজার কেজিই উৎপাদন করেন। অর্থাৎ সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু হঠাৎ একটি বন্যা বা অন্য কোনো কারণে চালের ফসল নষ্ট হয়ে গেল। ফলে অবশিষ্ট থাকল মাত্র ৩০০ কেজি চাল। অর্থাৎ চাহিদা আগের মতোই রয়ে গেছে, কিন্তু জোগান বা সরবরাহ কমে গেছে। ফলে মানুষ একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কিনতে চায় এবং দাম বাড়ে। এতে এক কেজি চালের দাম আগে ছিল ২০ টাকা, এখন তা ২৫ টাকা হয়ে যায়। যখন মানুষ কোনো পণ্য কিনতে প্রতিযোগিতা করে, তখন তারা দামের ওপর টান দেয়—এটিই চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি।

২. ব্যয়চালিত মূল্যস্ফীতি বা কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন

যখন জিনিসপত্র তৈরির খরচ বেড়ে যায়, তখন এটি ঘটে। ধরুন, একজন মুড়ি বিক্রেতা ১ কেজি মুড়ি ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। চাল কিনে তাঁকে মুড়ি ভাজতে হয়। কিন্তু বন্যায় তো চালের ফলন নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে মুড়ি বিক্রেতারও বেশি দামে চাল কিনতে হয়। এক কেজি মুড়ি বানাতে আগে লাগত—চাল এক কেজি ২০ টাকা, অন্যান্য খরচ ৫ টাকা, লাভ ৫ টাকা। মোট ৩০ টাকা।

কিন্তু এখন চলের দাম বেড়ে হয়ে গেছে ২৫ টাকা। বাকি সব খরচ একই থাকলেও লাভ করতে হলে বিক্রেতাকে এখন দাম বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করতে হবে।
এটিই হলো ব্যয়চালিত মুদ্রাস্ফীতি, যখন উৎপাদন ব্যয় দাম বাড়িয়ে দেয়।

৩. অন্তর্নিহিত মূল্যস্ফীতি বা বিল্ট-ইন ইনফ্লেশন

এটি ঘটে, যখন মূল্যবৃদ্ধি জীবনের ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং কর্মীরা বেশি বেতন দাবি করেন।

ধরা যাক, একটি জুতা তৈরি কারখানার কর্মীদের গড় জীবনযাত্রার খরচ ২০ হাজার টাকা এবং তারা মাসে ২৫ হাজার টাকা আয় করে। অর্থাৎ তারা ব্যয় মিটিয়ে কিছুটা সঞ্চয় করতে পারে। কিন্তু দাম বেড়ে গেলে তাঁদের মাসিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা। ফলে তাঁরা বেতন বাড়ানোর দাবি জানানো শুরু করেন। যদি কোম্পানি বেতন ২৫ হাজার টাকা করে, তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে কারখানাও তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এভাবে বেতন ও দাম একে অপরকে টানে এবং একটি চক্র তৈরি হয়।

৪. অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ

যখন অর্থনীতিতে অতিরিক্ত টাকা থাকে, তখনো দাম বেড়ে যেতে পারে। ধরা যাক, একটি রুটির দাম ১০ টাকা এবং পাঁচজনের কাছে রুটি কেনার জন্য ১০ টাকা করেই আছে। ফলে প্রত্যেকে একটি করে রুটি কিনছে। অর্থাৎ সব ঠিকঠাকই আছে।

কিন্তু যদি সরকার প্রত্যেককে আরও ১০ টাকা করে দেয়, তাহলে প্রত্যেকের কাছে এখন আছে ২০ টাকা। ফলে সবাই এখন দুটি রুটি কিনতে চায়, কিন্তু রুটি তো এখনো ৫টি! বেকারি এটা দেখে দাম বাড়িয়ে দেয়। এখন একটি রুটির দাম বেড়ে হয় ২০ টাকা।
এভাবেও টাকার মূল্য কমে যায় এবং দাম বাড়ে।

৫. মজুরি বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি

কর্মীদের বেতন বা মজুরি বাড়ার কারণে উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি ঘটে। কেননা এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামে যুক্ত করে দেয়।

ধরা যাক, একটি পোশাক কারখানায় কর্মীরা মাসে ৮ হাজার টাকা বেতন পেতেন। কর্মীদের বেতন বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হলো। এতে কারখানার মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কারখানার মালিক যদি আগের দামে পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে মুনাফা থাকবে না। তাই তিনি উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে বাজারে পোশাকসহ নানা পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিকে বলা হয়, মজুরি বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি। তবে যদি বেতনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদের উৎপাদনশীলতাও বাড়ে, তাহলে সমস্যা হয় না। সমস্যা তখনই হয়, যখন বেতন বাড়ে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ে না।

এটি কেইনসীয় অর্থনীতির একটি সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে ১৯৫০–৬০-এর দশকে যখন মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছিল, তখন এ ধারণা অর্থনীতিতে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

মূল্যস্ফীতি কীভাবে পরিমাপ করা হয়

সরকার এখন প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির হার প্রকাশ করে। এ নিয়ে আলোচনা হয়, গণমাধ্যমে নানা ধরনের সংবাদ প্রকাশ করা হয়। হার বেশি হলে আলোচনা-সমালোচনা বেশি হয়। কারণ, মূল্যস্ফীতি খুব বেশি হলে তা অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে।
কিন্তু এই মূল্যস্ফীতির হার কীভাবে পরিমাপ করা হয়? সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো এটি কীভাবে হিসাব করে? এই মূল্যস্ফীতি মাপার বিভিন্ন উপায় আছে, কিন্তু সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ভোক্তা মূল্যসূচক বা কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স বা সিপিআই।
সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, এই সিপিআই কী? এটি এমন একটি পদ্ধতি, যা দিয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে।

যেমন—

ক. ২০২৪ সালে দর:

• রুটি ৩০ টাকা, দুধ ৪০ টাকা, ডিম ৫০ টাকা, মোমবাতি ১০ টাকা, সিনেমার টিকিট ৫০ টাকা; মোট = ১৮০ টাকা।

খ. ২০২৫ সালে দর:

• রুটি ৩২ টাকা, দুধ ৪২ টাকা, ডিম ৫৫ টাকা, মোমবাতি ১২ টাকা, সিনেমা টিকিট ৫৫; মোট = ২০৭ টাকা।

তাহলে ১ বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এমন হলে সিপিআই ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ ধরা হয়।

খুব সহজ উদাহরণ দিলাম। বাস্তবে সিপিআই নির্ণয় করা বেশ জটিল। কেননা অনেক ধরনের পণ্যসেবা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই উদাহরণ দেওয়া হয়েছে একটি ধারণা দেওয়ার জন্য।

তবে এখানে কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। যেমন সিপিআই কম মানেই সবকিছুর দাম আস্তে আস্তে বাড়ছে—এটা ঠিক না।

আবারও উদাহরণ দিচ্ছি—
ক. প্রাথমিক প্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন:

• চালের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ

• গমের বেড়েছে ৫ শতাংশ

• ডিম ৬ শতাংশ

খ. কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, যেমন:

• মোমবাতি বেড়েছে মাত্র ১.২৫ শতাংশ

• সিনেমাল টিকিট একই আছে

ফলে সিপিআইয়ের গড় বৃদ্ধি কম হলেও মানুষ ‘দাম বেড়ে গেছে’ বলে মনে করবে। কারণ, তারা সবচেয়ে বেশি দরকারি জিনিসের দাম বাড়তে দেখছে। সুতরাং বলা যায়, সিপিআই শুধু একটি গড় হিসাব, সবকিছুর নিখুঁত প্রতিফলন নয়।
বাংলাদেশে সিপিআই যেভাবে নির্ণয় করা হয়

এ কাজ করে থাকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিবিএস একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভোক্তাদের খরচের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘ভোগ্যপণ্যের ঝুড়ি’ তৈরি করে। এ ঝুড়িতে খাদ্য, আবাসন, পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রতিটি পণ্যের জন্য একটি ওজন বা ওয়েট নির্ধারণ করা হয়, যা সেই পণ্যের খরচের অনুপাত নির্দেশ করে। বিবিএস শহর ও গ্রামের জন্য দুটি আলাদা ঝুড়ি তৈরি করে। সব মিলিয়ে এক হাজারের বেশি পণ্য এই ঝুড়িতে রাখা হয়।

প্রতি মাসে দেশের ৬৪টি জেলায় ১৫৪টি প্রধান বাজার থেকে ওই ঝুড়িভুক্ত পণ্যের বাজারমূল্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর মূল্যসূচক হিসাব করা হয়। এ জন্য নির্ধারিত ভিত্তি বছর অনুযায়ী, প্রতিটি পণ্যের দাম কতটুকু বেড়েছে, তা হিসাব করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অতি মূল্যস্ফীতি দেখা দিলে জার্মানির শিশুরা এভাবেই ডয়েসে মার্ক দিয়ে খেলত

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: কর ম দ র ১০ ট ক স প আই ২০ ট ক এক ক জ র জন য অর থ ৎ যখন ম উৎপ দ র খরচ সবক ছ

এছাড়াও পড়ুন:

‘ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিতে হবে’

ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে এখন থেকে ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ।

রবিবার (৩০ নভেম্বর) সিলেটের আলমপুর বিআরটিসি বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মাস্টার ইন্সট্রাক্টর সার্টিফিকেট প্রাপ্তির লক্ষ্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক মানের লাইসেন্স নিশ্চিত করতে ৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।’’

তিনি বলেন, দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৭৩ শতাংশের কারণ মোটরসাইকেল। এ সময় সবাইকে মানসম্পন্ন ও বিআরটিএ অনুমোদিত হেলমেট ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার দেবজিৎ সিংহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিআরটিএর পরিচালক রুবাইয়াৎ-ই-আশিক। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআরটিএ সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক প্রকৌশলী ডালিম উদ্দিন।

ঢাকা/রাহাত/রাজীব

সম্পর্কিত নিবন্ধ