প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের জন্য একীভূত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা। তাঁরা বলছেন, প্রতিটি বিদ্যালয়েই যেন প্রতিবন্ধী শিশুরা স্বাভাবিকভাবে শিখতে পারে, সে জন্য সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দপ্তরকে টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ইউকেএইডের ইনক্লুসিভ ফিউচারের উদ্যোগে এডিডি, সেন্স, সাইটসেভারস ও প্রথম আলো আয়োজিত ‘বাড়ি থেকে বিদ্যালয়: প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একীভূত শিক্ষার অগ্রগতি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন।

গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের একীভূত শিক্ষার আওতায় আনতে বিদ্যালয়গুলোয় সেই কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেখানে সরকারের সমাজ সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সহায়তা থাকতে হবে। তবে এ কাজে চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সহায়তার জন্য দেশে কমিউনিটি–ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তা প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিবার, সমাজ—সব পক্ষের জন্যই সহায়ক হবে। এ সময় এডিডি ইন্টারন্যাশনাল, সেন্স ইন্টারন্যাশনাল ও সাইটসেভারসের ‘শিখব সবাই’ প্রকল্পকে সাধুবাদ জানান তিনি। যুক্তরাজ্যের এফসিডিওর সহযোগিতায় ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্টের (ডিআইডি) আওতায় ইনক্লুসিভ ফিউচার উদ্যোগের অধীনে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বৈঠকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো.

সাইদুর রহমান খান। তিনি বলেন, এনজিও বা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কোনো প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তাই বিভিন্ন সফল প্রকল্পকে সরকারিভাবে গ্রহণ করে মূলধারায় নেওয়া প্রয়োজন।

বৈঠকে সাইটসেভারসের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও তাঁদের ‘শিখব সবাই’ প্রকল্পের আওতায় গুরুতর ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নেওয়া বাড়িভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের ফল হিসেবে অনেক গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে এবং তাদের ঝরে পড়া রোধ করা গেছে।

অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে দেখিয়েছেন সমন্বিত উদ্যোগে কীভাবে কোনো প্রতিবন্ধী শিশু উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এটি সরকারের জাতীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাইটসেভারসের গ্লোবাল টেকনিক্যাল লিড হামিশ হিগিংসন বলেন, ‘শিখব সবাই’ নামক ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট (ডিআইডি) প্রকল্পটি ছিল প্রোটোটাইপ ডিজাইনের উদ্যোগ। এখন বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে এই প্রোটোটাইপকে নিজেদের বাস্তবতায় রূপান্তর করার, উন্নয়ন করার, বিস্তৃত করার। এই মডেলকে জেলায়, উপজেলায়, ক্লাস্টারে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী সেটিকে অভিযোজন করতে হবে।

প্রত্যেক প্রতিবন্ধী শিশুরই শিক্ষা গ্রহণের অধিকার আছে বলে বৈঠকে মন্তব্য করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা তাহেরা জাবীন। গোলটেবিল বৈঠকে তিনি একীভূত শিক্ষার প্রতি যুক্তরাজ্যে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শুরু থেকেই সহায়তা নিশ্চিত করা, পরিবার ও কমিউনিটির সম্পৃক্ততা এবং বিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবন্ধী শিশুদের একীভূত শিক্ষার পথে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বলে বৈঠকে মন্তব্য করেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. সারওয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এখনো অনেক শিক্ষিত মানুষও বিশ্বাস করেন না যে প্রতিবন্ধী শিশুরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করতে পারে। এই মানসিকতার পরিবর্তনে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক এ কিউ এম শফিউল আজম বলেন, ‘অনেক শিক্ষক ভাবেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধী শিশু সমস্যা হতে পারে। এই মানসিকতা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ভিন্নভাবে পড়াতে হবে, সে যেন নিজেকে সেই পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে মিশিয়ে নিতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাজমুল বারী বলেন, ‘শিশুর প্রতিবন্ধিতার ধরন ও তীব্রতার ভিত্তিতে তার শিক্ষার পদ্ধতিও ভিন্ন হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে হোম বেজড এডুকেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা হিসেবে সামনে এসেছে। আমরা অনেক সময় এমন শিশুদের দেখি, যারা কখনো স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নই দেখে না কিংবা দেখার সুযোগ পায় না। তাদের জন্য বাসাভিত্তিক শিক্ষা একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।’

এডিডি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ প্রোগ্রামের টিম লিডার গোলাম ফারুক হামিম বলেন, বিদ্যালয়গুলোয় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, সেগুলোয় অনেক ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে স্কুলের প্রবেশগম্যতা, ওয়াশ ব্লক ব্যবহার, শ্রেণিকক্ষে বসা, সহায়ক উপকরণের ব্যবহার এবং শিক্ষকের কাছ থেকে পর্যাপ্ত নির্দেশনা গ্রহণ—এসব ক্ষেত্রে এখনো বাস্তবায়নের জায়গায় বড় ফাঁক রয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষাগত ও মানসিক চাহিদা অনুযায়ী আলাদা পরিকল্পনা থাকা জরুরি। দেশের শিক্ষকদের আন্তরিকতা আছে, সরকারিভাবে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হলে তাঁরা আরও উদ্দীপ্ত হবেন।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইটসেভারসের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন কো–অর্ডিনেটর খন্দকার সোহেল রানা। বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (সমন্বিত শিক্ষা) মো. জয়নাল আবেদীন ও সহকারী পরিচালক রুখসানা পারভীন, আইসিইভিআইর বাংলাদেশ প্রতিনিধি খন্দকার জহুরুল আলম, ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. সাইদুল হক, ইউনিসেফ বাংলাদেশের এডুকেশন ম্যানেজার জন ইকাজু, সাইটসেভারসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার লুসি রিভি, স্পন্দনের সিএসটি সদস্য ওয়াদুদ হাসান, আলোর প্রদীপ প্রতিবন্ধী অধিকার সংস্থার (সিরাজগঞ্জ) আল আমিন শেখ, সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (নরসিংদী) মাসুদুল হাসান তাপস, নরসিংদী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিরঞ্জন কুমার রায়, সিরাজগঞ্জের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ, ফারুক আজিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নরসিংদীর প্রধান শিক্ষক জয়শ্রী সাহা প্রমুখ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

উৎস: Prothomalo

কীওয়ার্ড: এক ভ ত শ ক ষ র ড ভ লপম ন ট ইনক ল স ভ দ র জন য প রকল প র চ লক এই প র সরক র সমন ব

এছাড়াও পড়ুন:

ইমরানের সঙ্গে কারও সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আদিয়ালা কারাগারে বন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে সব ধরনের সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা জানিয়েছেন। তিনি ইমরান খানকে ‘যুদ্ধোন্মাদনায় আচ্ছন্ন এক চরমপন্থী’ বলে আখ্যা দেন। গত শুক্রবার জিও নিউজের ‘নয়া পাকিস্তান’ অনুষ্ঠানে তারার এ কথা বলেন।

এর আগে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী ইমরান খানকে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই ইমরান খানের সঙ্গে অন্যদের সাক্ষাৎ বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন।

তারার বলেন, ‘আইন ও নির্ধারিত বিধি অনুসারেই বন্দীদের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এখন ইমরান খানের সঙ্গে সব ধরনের সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ।’ কারাগারের বাইরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রীর দাবি, কারা বিধি অনুযায়ী যেকোনো সাক্ষাতের সময় কারা সুপার উপস্থিত থাকেন। কর্মকর্তারা ইমরানের সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে আসা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক আলোচনা এবং ইমরানের নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি লক্ষ করেছেন।

পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাগারে রয়েছেন। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে সন্ত্রাসবাদ পর্যন্ত নানা ধরনের অসংখ্য মামলা রয়েছে।

ইমরান খানের বিরুদ্ধে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধ্বংসের চেষ্টা এবং রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে ক্ষমতাসীন জোট সরকার।

তারার বলেন, ইমরান খান ও তাঁর দল দেশকে দেউলিয়া করার দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। পাকিস্তানকে দেউলিয়া করতে আইএমএফে (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ৯ মে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছিল।

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়েই সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রবিরোধী বয়ান তৈরি করছেন।

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন

তথ্যমন্ত্রী তারার বলেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন জারির বিষয়টি ফেডারেল সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

সমঝোতার সুযোগ নেই

পিটিআইয়ের সঙ্গে এখনো সমঝোতার সুযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তারার বলেন, ‘তারা সুযোগ নষ্ট করেছে। যারা বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থী চিন্তাধারা ছড়ায়, তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না।’ তবে পিটিআই ক্ষমা চাইলে ও অনুশোচনা করলে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।’

ইমরানের বোনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

জিও নিউজের অনুষ্ঠান ‘আজ শাহজেব খানজাদা কে সাথ’-এ কথা বলতে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, ইমরান খানের বোন উজমা খানের সাম্প্রতিক ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার সাবেক ক্ষমতাসীন দলের জন্য কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। তিনি বলেন, পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা সব সময় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংলাপে বসতে অস্বীকার করেছেন এবং দলটির কোনো সদস্যের পাকিস্তানবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধেও পিটিআই কখনো নিন্দা জানায়নি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ