ভুয়া কাগজপত্র দি‌য়ে প্রায় ২৭১ কোটি টাকা ঋণ নি‌য়ে আত্মসাত ও পাচা‌রের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ ও আলোচিত পিকে হালদারসহ ১৫ জনের বিরু‌দ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার (২ জুলাই) দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এসব মামলা দায়ের করা হয়।

দুদ‌কের মহাপরিচালক মো.

আক্তার হোসেন সেগুনবা‌গিচার প্রধান কার্যাল‌য়ে নিয়‌মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ‌্য জানান।

আরো পড়ুন:

অর্থপাচার মামলায় কলকাতায় পি কে হালদারের জামিন

‘বিচার শেষ না হওয়ায় পি কে হালদারকে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না’

প্রথম মামলার এজাহারে বলা হয়, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড (বর্তমানে আভিভা ফাইন্যান্স) থেকে জাল কাগজপত্রের ভিত্তিতে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোস্তফা অ্যান্ড কোম্পানির নামে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেয়াদি ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। পরে সেই টাকা কয়েক ধাপে স্থানান্তর হয়ে এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেডে চলে যায়।

এই মামলার আসামিরা হলেন- এস আলম গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, এম আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসান, পরিচালক শাহানা ফেরদৌস, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ইভিপি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রধান রাশেদুল হক, একই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও কর্পোরেট ফাইন্যান্স বিভাগ প্রধান নাহিদা রুনাই, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ক্রেডিট কমিটির এসভিপি ও মেম্বার কাজী আহমেদ জামাল, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজার জুমারাতুল বান্না, মারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ, পরিচালক টিপু সুলতান, মো. ইসহাক ও মেসার্স মোস্তফা অ্যান্ড কোম্পানির মালিক মো. গোলাম মোস্তাফা।

দ্বিতীয় মামলায় নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান মেসার্স এ এম ট্রেডিংয়ের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে ১০৪ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ ও ৩৪ কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অপরাধমূলক অসদাচরণ ও বিশ্বাসভঙ্গ করে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঋণপ্রস্তাব প্রস্তুত এবং ঋণ অনুমোদন, ঋণ প্রদান এবং ঋণের নামে ১০৪ কোটি ২০ লাখ ৭৭ হাজার ৭০৮ টাকা আত্মসাৎ ও ৩৪ কোটি টাকা এস আলম সুপার এডিবল অয়েল নামে প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর/রূপান্তর/হস্তান্তর করা হয়েছে।

এই মামলার আসামিরা হলেন- এস আলম গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, এম আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসান, পরিচালক শাহানা ফেরদৌস, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ইভিপি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রধান রাশেদুল হক, একই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও কর্পোরেট ফাইন্যান্স বিভাগ প্রধান নাহিদা রুনাই, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ক্রেডিট কমিটির এসভিপি ও মেম্বার কাজী আহমেদ জামাল, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজার জুমারাতুল বান্না, মারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ, পরিচালক টিপু সুলতান, মো. ইসহাক ও মেসার্স মেসার্স এ এম ট্রেডিংয়ের মালিক আলহাজ কবির আহম্মদ।

তৃতীয় মামলায় নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাইফুল অ্যান্ড কোম্পানির নামে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ৭১ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ ও ২৪ কোটি টাকার মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

ওই মামলার এজাহার বলা হয়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের কর্মকর্তা এবং মেসার্স সাইফুল অ্যান্ড কোম্পানির মালিক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ২০১৩ সালের ৩ অক্টোবর তারিখে মেয়াদি ঋণ মঞ্জুর করা হয়। ঋণের ২৪ কোটি টাকা ২০১৩ সালের ৪ নভেম্বর সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, দিলকুশা শাখা থেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, খাতুনগঞ্জ শাখার মেসার্স সাইফুল অ্যান্ড কোম্পানি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে একই দিনে মারিন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড হয়ে এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর হয়। প্রতিটি ধাপেই জালিয়াতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনা সংঘটিত হয় বলে দুদক মনে করে।

এই মামলার আসামিরা হলেন—এস আলম গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, এম আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, আব্দুস সামাদ, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসান, পরিচালক শাহানা ফেরদৌস, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ইভিপি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রধান রাশেদুল হক, একই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও কর্পোরেট ফাইন্যান্স বিভাগ প্রধান নাহিদা রুনাই, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ক্রেডিট কমিটির এসভিপি ও মেম্বার কাজী আহমেদ জামাল, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজার জুমারাতুল বান্না, মারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ, পরিচালক টিপু সুলতান, মো. ইসহাক ও মেসার্স সাইফুল অ্যান্ড কোম্পানির মালিক সাইফুল ইসলাম।

ঢাকা/নঈমুদ্দীন/ফিরোজ

উৎস: Risingbd

কীওয়ার্ড: চ কর চ কর র ল য় ন স ফ ইন য ন স ল ম ট ড র র ল য় ন স ফ ইন য ন স র এস আলম গ র প র স ব স থ ন ন তর ক গজপত র জন র ব র আস ম র আহম দ ইসল ম র আহম

এছাড়াও পড়ুন:

মাওনায় কম দামে জমি—এ কথা বলে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের কাছ থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নেন তাঁরা

গাজীপুরের শ্রীপুরে জমি বিক্রি করার কথা বলে সাবেক একজন অতিরিক্ত সচিবের কাছ থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দুই প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা রোড এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে চারটি মুঠোফোন, একটি প্রাইভেট কার ও সাড়ে ৪৬ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সায়েদুল ইসলাম (৪১) ও মো. শাহীন কাজী (৪৪)। আজ শুক্রবার সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাবেক ওই অতিরিক্ত সচিব গত ৩১ মে দারুস সালাম থানায় প্রতারণার মামলা করেন। পরে ওই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। মামলাটির তদন্তভার গ্রহণের পর সিআইডি আসামিদের ব্যাংক লেনদেন যাচাই, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ এবং ভুক্তভোগীর বর্ণনার ভিত্তিতে প্রতারক সায়েদুল ইসলাম ও শাহীন কাজীকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে চারটি মুঠোফোন, চারটি সিম, একটি প্রাইভেট কার এবং সাড়ে ৪৬ হাজার টাকা জব্দ করে। সিআইডির তদন্তে দেখা যায়, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে বায়নানামার কথা বলে অর্থ গ্রহণ করলেও জমিটি তাঁদের মালিকানায় ছিল না।

মামলা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে জানান, আসামিরা সাবেক ওই সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এক পর্যায়ে তাঁর আস্থা অর্জন করেন। পরে তাঁরা গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় ২২ বিঘা জমি কিনতে তাঁকে প্রলুব্ধ করেন। এরপর দলিলপত্র তৈরি, ভূমি অফিসে যোগাযোগ, রেজিস্ট্রি প্রস্তুত—এমন নানা অজুহাতে প্রতারিত ব্যক্তির কাছ থেকে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মোট ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর তাঁরা ভুক্তভোগীকে ২৬ মে জমি রেজিস্ট্রি (নিবন্ধন) করে দেবে বলে জানান। কিন্তু ওই দিন সকাল থেকেই প্রতারকদের ফোন বন্ধ পাওয়ার পর ভুক্তভোগী নিশ্চিত হন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

আজ সন্ধ্যায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতারণার শিকার সাবেক ওই অতিরিক্ত সচিব প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তিনি। এর সূত্রে সায়েদুল তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তিনি জানান তাঁর ‘বস’ ফ্ল্যাটটি কিনবেন। সায়েদুল নিজেকে একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি বলে পরিচয় দেন। ফোন করে ও দেখা করে সায়েদুল তাঁর সঙ্গে আন্তরিকতা গড়ে তোলেন। সায়েদুল একদিন তাঁকে বলেন, শ্রীপুরের মাওনায় অনেক কম দামে ২২ বিঘা জমি বিক্রি হবে। দাম কম হওয়ায় তিনি (সায়েদুল) জমিটি বায়না করলেও ওই জমি কেনার তাঁর সামর্থ্য নেই। এখন জমিটি যদি সাবেক অতিরিক্ত সচিব কিনে আরেকজনের কাছে বিক্রি করেন, তাতে বিপুলভাবে (সাবেক অতিরিক্ত সচিব) লাভবান হবেন তিনি। এ জন্য সায়েদুল একজনকে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সাজিয়ে তাঁর সঙ্গে ভুক্তভোগীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু কথিত ওই ক্রেতা প্রতারক চক্রের সদস্য, তা তিনি বুঝতে পারেননি।

ভুক্তভোগী বলেন, সায়েদুলের নামে করা বায়না ও জমির কাগজপত্রও তাঁকে দেওয়া হয়। সায়েদুলের মামা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত এবং তিনি বিদেশে আছেন, সেখানে ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে। টাকার জন্য বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যায় আছেন—এমন আকুতি করে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কয়েক ধাপে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নেন সায়েদুল। তিনি কেমন যেন সায়েদুলের আচরণে ‘কনভিন্সড’ হয়ে গিয়েছিলেন। যেদিন জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার কথা, সেদিন সায়েদুলকে ফোন করলে তিনি বলেন, তাঁর মা মারা গেছেন। লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। পরে আরেক দিন ফোন করলে সায়েদুল বলেন, তাঁর খালাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। সায়েদুল ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ডে সন্দেহ হওয়ায় সায়েদুলের দেওয়া জমির কাগজপত্র শ্রীপুরের এসি ল্যান্ডের (সহকারী কমিশনার-ভূমি) কাছে পাঠালে ওই কর্মকর্তা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে বলেন, এসব কাগজপত্র ভুয়া। এ সময় বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • মাওনায় কম দামে জমি—এ কথা বলে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের কাছ থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নেন তাঁরা