শ্রমিকের তিন দিনের মজুরিতেও মিলছে না এক কেজি ইলিশ
Published: 4th, July 2025 GMT
একসময় ইলিশ ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির রসনাবিলাসের অন্যতম অনুষঙ্গ। ইলিশের মৌসুমে প্রতিদিন না হোক, মাঝে মাঝে পাতে থাকত এ মাছ। প্রতিবেশীর ঘর থেকেও ভেসে আসত ইলিশের ঘ্রাণ। অথচ, সেই মাছ এখন মধ্যবিত্ত মানুষদের সাধ্যের বাইরে। নিম্নবিত্তরা তো ইলিশ খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেন না। জাতীয় মাছ ইলিশ এখন শোভা পায় উচ্চবিত্তদের খাবার মেন্যুতে। এই মাছ এখন বিলাসপণ্য।
শুক্রবার (৪ জুলাই) রাজধানীর রায়েরবাগ ও যাত্রাবাড়ীতে এক কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এই দাম একজন শ্রমিকের তিন দিনের মজুরির চেয়েও বেশি।
চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা পাথরঘাটার আড়তেও মাঝারি আকারের ইলিশের দাম কেজিতে ১ হাজর ৭০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা। অথচ, বাজারে ইলিশের সরবরাহ ভালো।
আরো পড়ুন:
‘অস্বাভাবিক কোনো কারণে যেন ইলিশের দাম না বাড়ে’
আমাদের একার নয়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েরও দায়িত্ব আছে: মৎস্য উপদেষ্টা
নজরদারিতে ঘাটতি, সিন্ডিকেটের জাল
বাংলাদেশে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ হাজার টন কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর জন্য দায়ী মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে দুর্বল অভিযান, নিষিদ্ধ মৌসুমে মাছ ধরা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মহাসচিব মো.
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ শাখার সহকারী পরিচালক এম ফারুক ময়েদুজ্জামান বলেছেন, “আমাদের জনবল ও প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা সম্ভব হয় না। এ সুযোগেই অসাধু জেলে ও ব্যবসায়ীরা নিষিদ্ধ সময়েও ইলিশ ধরছে।”
সাগর খোলা, তবু বাজারে আগুন
গত ১১ জুন মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই। বরং, দাম আরো বেড়েছে। চাঁদপুর, ভোলা, বরগুনার আড়তে এক কেজি ইলিশের দাম উঠেছে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসিন উদ্দিন জানিয়েছেন, ইলিশ নিলামের নামে কারসাজি চলছে। গোপন সিন্ডিকেট বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
তবে, চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির নেতা শবে বরাত বলেছেন, আগে যেমন মাছ পাওয়া যেত, এখন তা আর হয় না। জাল, জাহাজ ও জ্বালানির খরচ বেড়েছে। দাম বাড়তেই পারে।
১০ বছরে ৩২৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে এক কেজি ইলিশের দাম ছিল ৫৯০ টাকা। ২০২৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। ২০২৫ সালে এসে তা আড়াই হাজার টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র এক দশকে ইলিশ মাছের দাম বেড়েছে ৩২৪ শতাংশ।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইলিশ তো চাষ করা হয় না, সাগর থেকে ধরা হয়, তাহলে এই বিশাল মূল্যবৃদ্ধি কেন? পাঙ্গাস বা রুইয়ের দাম তো বাড়েনি।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কাগজে-কলমে
ইলিশের বাজারে লাগাম টানতে সরকার এখনো কোনো সমন্বিত বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন কিছু উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। ইলিশের মূল্য নির্ধারণ, আড়ত সংস্কার কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি—সবই এখনো খবরে সীমাবদ্ধ।
মৎস্য উপদেষ্টার আহ্বান: বাস্তবভিত্তিক সমাধান দরকার
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, ইলিশসহ অন্যান্য মাছের দাম ঘোষণার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, বরং মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
তিনি জানান, অবৈধ জাল ও জেলেদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে, নদীর নাব্য সংকট ইলিশের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গবেষণা, প্রযুক্তি আর প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ইলিশ শুধু ছবিতে থাকবে, পাতে নয়।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
স্যাটেলাইট, ড্রোন ও ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে মাছ ধরার মৌসুমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিলাম প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে লাইসেন্স ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। নদী ও সাগরে ইলিশের চলাচল ট্র্যাক করে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, ইলিশ শুধু মাছ নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এই স্বাদ যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে তা আমাদের ঐতিহ্যকেই আঘাত করবে।
তিনি জানান, আজ যাত্রাবাড়ীতে ছোট ইলিশ (৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম) ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি ইলিশ (৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম) ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং বড় ইলিশ (১ কেজি) ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী বাজারে এক কেজির একটি ইলিশ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সিরাজ রহমান। পাশে তার সন্তান। সিরাজ রহমান বলেন, এই ইলিশের দাম তো আমাদের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিনে খাওয়া যাচ্ছে না। আবার না কিনলে সন্তানের মন ভাঙবে।
তিনি বলেন, ইলিশ শুধু খাদ্য নয়, এই মাছ বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। সেই রূপালি ইলিশের স্বাদ যদি শুধুই স্মৃতি হয়ে ওঠে, তাহলে হারাবে আমাদের সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অনুষঙ্গ। নজরদারি জোরদার করে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে মানুষের নাগালে ফিরিয়ে আনার এখনই সময়।
ঢাকা/রফিক
উৎস: Risingbd
কীওয়ার্ড: চ কর চ কর উপদ ষ ট নজরদ র এক ক জ আম দ র বল ছ ন মৎস য ব যবস রহম ন
এছাড়াও পড়ুন:
সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নজরদারিমূলক অভিযান
মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ওপর লক্ষ্য করে নজরদারি, তথ্য চুরি ও অ্যাকাউন্ট দখলের ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা দ্য ইউএস সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি (সাইসা)। সংস্থাটি বলছে, বাণিজ্যিক গুপ্তচর সফটওয়্যার ও রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান ব্যবহার করে দক্ষ সাইবার হামলাকারীরা সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যমে অনুপ্রবেশ করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরো মোবাইল ডিভাইস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে।
সাইসার তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় সামাজিক প্রকৌশল কৌশল, ব্যবহারকারীর অসতর্কতা ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা তিনটিই সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ভুক্তভোগীর অ্যাপে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী ধাপে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রেরণ করা হয়, যার মাধ্যমে ডিভাইসের অভ্যন্তরের তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়।
চলতি বছরের শুরু থেকে এ ধরনের একাধিক অভিযান শনাক্ত হয়েছে। সিগন্যাল অ্যাপের ‘লিংকড ডিভাইস’ সুবিধার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘প্রোস্পাই’ ও ‘টু স্পাই’ নামের দুটি অ্যান্ড্রয়েড স্পাইওয়্যার প্রচারণায় সিগন্যাল ও টোটকের নকল সংস্করণ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। আরেকটি অভিযানে ‘ক্লের্যাট’ নামের অ্যান্ড্রয়েড গুপ্তচর সফটওয়্যার ব্যবহার করে রাশিয়ার ব্যবহারকারীদের নিশানা করা হয়। সেখানে টেলিগ্রাম চ্যানেল ও নকল ডাউনলোড সাইট ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টিকটক ও গুগল ফটোজের মতো একই রকম দেখতে ভুয়া অ্যাপ ইনস্টল করিয়ে ডেটা চুরি করা হয়।
একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপের দুটি নিরাপত্তা দুর্বলতার (সি–ভি–ই ২০২৫–৪৩৩০০ ও সি–ভি–ই ২০২৫–৫৫১৭৭) ত্রুটি ব্যবহার করে প্রায় ২০০ জনের কম ব্যবহারকারীকে লক্ষ্য করে আলাদা আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। আবার স্যামসাংয়ের নিরাপত্তা দুর্বলতা (সি–ভি–ই ২০২৫–২১০৪২) কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গ্যালাক্সি ডিভাইসে ‘ল্যান্ডফল’ গুপ্তচর সফটওয়্যার আক্রমণের ঘটনাও সাইসা নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, ডিভাইস লিংক কিউআর কোডের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট দখল, জিরো ক্লিক হামলা ও জনপ্রিয় অ্যাপের নকল সংস্করণ ছড়িয়ে ব্যবহারকারীকে ভুল পথে চালিত করার মতো কৌশল দেখা যাচ্ছে। এসব তৎপরতার মূল লক্ষ্য সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাগরিক সমাজের কর্মী এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
সাইসা বলছে, নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশনযুক্ত মেসেজিং ব্যবহার করা জরুরি। ফিশিং–প্রতিরোধী ‘ফাইডো’ পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবহার করতে হবে এবং মাল্টি ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনে এসএমএস–নির্ভরতা এড়িয়ে চলা উচিত। পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় আলাদা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার উপযোগী।
মোবাইল অপারেটর অ্যাকাউন্টে পিন চালু করা এবং ডিভাইস ও সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখা নিরাপত্তা জোরদার করে। সাইসার মতে, সম্ভব হলে সবশেষ মডেলের ফোন ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত ভিপিএন ব্যবহার না করাই উত্তম। আইফোন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে লকডাউন মোড চালু রাখা, আইক্লাউড প্রাইভেট রিলে সক্রিয় রাখা এবং সংবেদনশীল অ্যাপের অনুমতি সীমিত রাখতে পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এনক্রিপশন সক্রিয় থাকলে তবেই আরসিএস ব্যবহার, গুগল ক্রোমে বাড়তি নিরাপত্তা সুরক্ষা চালু রাখা, গুগল প্লে প্রটেক্ট সচল রাখা ও নিয়মিত অ্যাপের অনুমতি পর্যালোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
সূত্র: দ্য হ্যাকার নিউজ