সেমিকন্ডাক্টর খাতে ১০ বছরের কর অব্যাহতি ও শুল্কছাড়ের সুপারিশ
Published: 3rd, July 2025 GMT
সেমিকন্ডাক্টর খাতে বর্তমানে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের (৬ মিলিয়ন) রপ্তানি আয় আসছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই রপ্তানি আয় এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ জন্য খাতটিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ বছর কর অব্যাহতি, নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশে শুল্কছাড় ও বিশেষ তহবিল সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টরশিল্পের উন্নয়নে গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম হারুন-উর-রশিদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সৈয়দ মাহফুজুল আজিজ ও সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান উল্কাসেমির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান।
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টরশিল্পের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গত ১ জানুয়ারি ১৩ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে এই টাস্কফোর্স প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেবে।
তবে সেই প্রতিবেদন তৈরি করতে প্রায় ছয় মাস লেগে যায়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয় টাস্কফোর্স। প্রতিবেদনের সুপারিশমালা আজ গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
দেশের সেমিকন্ডাক্টর খাতের উন্নয়নে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি পথনকশা দিয়েছে টাস্কফোর্স। এগুলো হলো দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি ও নীতিগত সহায়তা এবং বৈশ্বিক সংযোগ। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা এবং নীতিগত সহায়তার সুপারিশ করা হয়েছে।
টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে বলা হয়, সেমিকন্ডাক্টর খাতে তিনটি ধাপ রয়েছে—চিপ ডিজাইন, উৎপাদন এবং টেস্টিং ও প্যাকেজিং। এর মধ্যে চিপ ডিজাইনে তাৎক্ষণিকভাবে; টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তবে চিপ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ ও দক্ষ লোকের দরকার। তাই এটিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, সেমিকন্ডাক্টর খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ২০২৫-২৬ সালের মধ্যেই স্পষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন চিপ অ্যাসেম্বলিং ও প্যাকেজিং কারখানার জন্য গবেষণাকাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে ১০ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে।
এ খাতের জন্য বন্ড–সুবিধা এবং শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে একটি ‘সেমিকন্ডাক্টর তহবিল’ গঠনের প্রস্তাব করেছে টাস্কফোর্স। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু আমদানি করা যন্ত্রাংশ, যেমন সার্ভার, নেটওয়ার্ক ডিভাইস, সাইবার নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রভৃতিতে শুল্ক মওকুফের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
স্বল্প মেয়াদে অবকাঠামো খাতেও কিছু উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, হাইটেক পার্কে সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য বিশেষ এলাকা বরাদ্দ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানে একটি ‘ক্লিনরুম’ স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে প্রাথমিকভাবে চিপ প্যাকেজিং ও টেস্টিং মেশিন স্থাপন করা যাবে।
২০২৭ থেকে ২০২৯ সালে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় সেমিকন্ডাক্টর খাতে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। আর দক্ষতা উন্নয়নের জন্য মধ্য মেয়াদে নির্দিষ্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কোর্স চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের পর থেকে কিছু নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিকন্ডাক্টর বিষয়ে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
.উৎস: Prothomalo
কীওয়ার্ড: র স প র শ কর র জন য
এছাড়াও পড়ুন:
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষা ও এর সংরক্ষণ
বাংলাদেশের ছোট ভূখণ্ডে বহু জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের বসবাস। ইতিহাস, ভূগোল ও বিভিন্ন সময়ের আগমনপ্রবাহ মিলিয়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। এখানে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের গৌরবময় অংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, শুধু শেরপুর জেলায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৮৪০, যাদের মধ্যে গারো, কোচ, বর্মণ, হাজং, ডালু, হুদি, পাত্র, সৌরা, মসুর, মারমা, ম্রো, চাক, মাহালিসহ ১৬টিরও বেশি সম্প্রদায় রয়েছে। প্রতিটি গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা, যা তাদের অস্তিত্বের মূল পরিচয়।
আদিবাসী সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত ভাষা ৩৫টির বেশি। এই ভাষাগুলো মূলত তিনটি বৃহৎ ভাষা পরিবারে বিভক্ত। তিব্বত-বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, ম্রো, বম, লুসাই প্রভৃতি। এগুলো স্বরনির্ভর এবং প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির প্রভাব বহন করে।
এদিকে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহার করে সাঁওতাল, খাসি, মান্দি, ওঁরাও প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী। তাদের ভাষার শব্দভান্ডার প্রকৃতি, কৃষি, নদী-জঙ্গলকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে রোহিঙ্গা, কোচ, বেলে ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোয় আরবি-ফারসি শব্দের প্রভাব স্পষ্ট।
ব্রিটিশ শাসনামলে মিশনারি বিদ্যালয়গুলোয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ ছিল; অনেক ভাষার জন্য লিপিও উদ্ভাবন করা হয়েছিল। তবে প্রশাসন ও সামাজিক ব্যবস্থায় বাংলা, ইংরেজি এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে উর্দুর একক আধিপত্য তাদের ভাষাশিক্ষার সুযোগ ক্রমে সংকুচিত করে দেয়।
স্বাধীনতার পর ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঁচটি মাতৃভাষায় বই প্রণয়ন, গবেষণা ও ভাষা নথিভুক্তকরণে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বইয়ের স্বল্পতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অনেক জাতিগোষ্ঠী ভারত থেকে শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকায় তারা আবার বাংলায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
প্রান্তিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ঘাটতি মানুষকে শহরমুখী করছে। শহরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রভাব বিস্তার, গণমাধ্যমের ভাষাগত আধিপত্য এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা-অবহেলা শিশুদের ভাষাগত চর্চা দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে মাতৃভাষা ব্যবহার করায় হেনস্তা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের। অনেকে মানসিক চাপ সইতে না পেরে পড়াশোনা কিংবা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
চাকমা, খুমি, খিয়াং, পনু, ম্রো, লুসাই, কচ, রং, পাংখোসহ বহু ভাষা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সংস্কৃতির স্বাদ, ইতিহাস, পরিচয় ও জীবনের নিজস্ব অর্থ। এ দেশের মানুষ ভাষার মর্যাদার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছে। মাতৃভাষার প্রতি সেই শ্রদ্ধা যদি আজ বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা আমাদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।
বিলুপ্তপ্রায় ভাষা রক্ষা করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিয়মিত সরবরাহ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনে অনুবাদক নিয়োগ, সমাজে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ভাষা সংরক্ষণে অভিধান, ব্যাকরণ, লিখিত রূপ তৈরি, ভাষার সমান অধিকার নিশ্চিতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
কোনো ভাষাগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কখনোই একটি রাষ্ট্র এগোতে পারে না। আর উন্নতির সেই যাত্রায় ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় ও মর্যাদার বাহক। দেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লাবনী আক্তার শিমলা শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়