বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা প্রদানের মুখ্য ভূমিকায় থাকেন চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান প্রমুখ পেশাজীবী। কিন্তু একদল কর্মী আছে, যাদের নাম তালিকায় থাকে না, যাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয় না, অথচ যাদের কাজ ছাড়া হাসপাতালের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তারা হচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো দেশের প্রান্তিক জনগণের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি। সেখানে আজ স্বাস্থ্যসেবার এক অপ্রকাশিত ও নীরব সংকট গভীরভাবে বাসা বেঁধেছে। সংকটটি শুধু ওষুধ বা ডাক্তার ঘাটতির নয়। বরং এটি এমন এক অব্যবস্থাপনার ফল, যা হাসপাতালের ভেতরেই রোগ ছড়ানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে। এ সংক্রমণের দায় কোনো একক গোষ্ঠীর নয়; বরং এটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।

‘হাসপাতালে গিয়ে ভালো না হয়ে আরও অসুস্থ হয়ে এলাম’– এই অভিযোগটি আজকাল শুধু কথার কথা নয়। এটি বাস্তব। বাংলাদেশে হাসপাতালভিত্তিক রোগ সংক্রমণের হার ক্রমেই বাড়ছে। একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রোগী যদি নতুন করে সংক্রমিত হয়, তাহলে সেটি হয় হাসপাতালের পরিবেশের কারণে। এই সংক্রমণগুলো রোগীর সুস্থতা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে জীবননাশের কারণও হতে পারে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদল মানুষ দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যান হাসপাতালের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে– তারা হলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাদের কাজ কেবল অপরিহার্যই নয়, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গবেষণা ও কিছু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট মতে, সরকারি হাসপাতালগুলোর অনেকটিতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রোগী ভর্তি হওয়ার পর নতুন সংক্রমণের শিকার হন। যার মধ্যে রয়েছে– ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন, নিউমোনিয়া, সার্জিক্যাল সাইটইনফেকশন ও সেপসিস। এ সংক্রমণ শুধু রোগীর শারীরিক ক্ষতি করে না; বরং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আর্থিক বোঝাও বাড়িয়ে তোলে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী? সরকারের স্বাস্থ্য খাতে যেসব সংস্কার হয়েছে– যেমন অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন হাসপাতাল স্থাপন, ডাক্তার নিয়োগ; তার কোনোটিতেই পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, তদারকি ও সম্মান নিশ্চিত না করে কোনো হাসপাতালকে কার্যকরভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’ রাখা যায় না।

একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী যখন মাসের পর মাস বিনা গ্লাভস, বিনা মাস্কে হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ করেন– তা কেউ দেখেন না। অথচ সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রথম প্রাচীর তারাই। বাংলাদেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা চুক্তিভিত্তিক বা দৈনিক মজুরিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বেতন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে, যা মাসের পর মাস বন্ধ থাকে। কিছু হাসপাতালে দেখা গেছে, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ৩০-৪০ শয্যার পুরো ওয়ার্ড পরিষ্কার রাখতে হয়। যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, একজন কর্মী সর্বোচ্চ ১০-১৫ শয্যার জন্য উপযুক্ত।
আরও উদ্বেগের বিষয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনেকেই জানেন না কীভাবে সঠিকভাবে জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে হাসপাতালের সংবেদনশীল এলাকাগুলো পরিষ্কার করতে হয়, কিংবা কীভাবে নিজেকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হয়। তাদের কোনো নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেই। অনেক সময় নিজেরাই আক্রান্ত হন এবং বিনা চিকিৎসায় বাড়ি ফিরে যান। তবে তাদের জীবন চলে চরম অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ফলে তারা সরকারি চাকরির সুযোগ-সুবিধা পান না এবং তাদের নিয়মিত বেতন হয় না। কাজের সময় নির্দিষ্ট নয়, কাজের চাপ অমানবিক।

এই কর্মীরা হাসপাতালে রোগীর রক্ত, বর্জ্য, সংক্রমণ, অপারেশনের পরবর্তী জীবাণু ইত্যাদি পরিষ্কারের কাজ করেন– যে কাজটি সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর এই কাজ অত্যন্ত বায়োলজিক্যাল হ্যাজার্ডস বা জীবাণু-সম্পর্কিত বিপদের মধ্যেই পড়ে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিজেরাই বিভিন্ন চর্মরোগ, সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট ও ভাইরাল ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকেন। কোনো দুর্ঘটনা বা সংক্রমণ হলে সরকারি সাহায্য বা চিকিৎসাসেবাও মেলে না। অনেক সময় প্রতিষ্ঠান এসব দায় অস্বীকার করে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়োগ ব্যবস্থায় রয়েছে বিস্তর অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি। যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, এই নিয়োগ সাধারণত হয় ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে। প্রতিবছর-দুই বছর মেয়াদে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ পায়। তারাই পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেয়। এখানে রয়েছে কর্মী নিয়োগে ঘুষ দাবি, অস্থায়ী চুক্তিপত্র, কাজের পরও বেতন বন্ধ রাখা। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় সমস্যা। কর্মীদের নিয়মিতভাবে আধুনিক পরিচ্ছন্নতা পদ্ধতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে তারা পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ করেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচ্ছন্নতা খাতকে এখনও সহায়ক সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর  ফলে পরিচ্ছন্নতা খাতে নেই আলাদা বাজেট লাইন, নেই স্থায়ী নিয়োগ কাঠামো, নেই দক্ষতা উন্নয়ন বা পেশাগত প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ গাইডলাইনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কার্যকর ভূমিকা স্পষ্ট নয়; হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মতামতের কোনো জায়গা নেই। অথচ বিশ্বের অনেক দেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে স্বীকৃত হন। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের পেশাটি এখনও ‘বর্জ্য অপসারণকারী’ বলেই পরিচিত, যা একটি শ্রেণিবৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম: সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

.

উৎস: Samakal

কীওয়ার্ড: জনস ব স থ য স ক রমণ বর জ য র জন য সরক র

এছাড়াও পড়ুন:

অবকাঠামো বৈষম্য ও প্রবেশাধিকার সমতা 

‘‘আমার একজোড়া পায়ের প্রয়োজন ছিল
যা যে কোনো পথেই হাঁটতে পারবে’’

হ্যাঁ, একজন পদহীন মানুষের জন্য যে কোনো পথেই হাঁটা সহজ কথা নয়। অন্তত যেখানে প্রবেশাধিকারের সমতা নেই। প্রতিবন্ধী মানুষকে এ দেশে প্রতিদিনই প্রমাণ করতে হয়, তিনিও এই দেশের নাগরিক এবং সেই নাগরিকের মৌলিক অধিকার অবাধ চলাচল, এই সুবিধা তারও প্রাপ্য। যদিও প্রতিনিয়ত খর্ব হয় তার এই মৌলিক অধিকার। তবে প্রবেশাধিকার নিয়ে বলার  আগে একটি বিষয় বলে নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছি। 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দের ব্যবহার আছে। তবে তা আগের মতো সরল নয়। এই শব্দের পেছনের দর্শন বদলে গেছে। এখন বিশ্বে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে ‘প্রতিবন্ধী’ বলে না। বরং সমাজ ও পরিবেশ যে বাধা সৃষ্টি করে, সেই বাধাকেই প্রধানত প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয়।

জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে Persons with Disabilities (PWD) অর্থাৎ ‘প্রতিবন্ধিতা সম্পন্ন ব্যক্তি’ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি। বাংলাদেশেও আইনগতভাবে যা স্বীকৃত। ২০১৩ সালের ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে’ ব্যবহার করা হয়েছে Persons with Disabilities কেন অক্ষম বা পঙ্গু বলা হয় না? আন্তর্জাতিকভাবে এসব শব্দকে অবমাননাকর, অসম্মানজনক, পুরোনো মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে ধরা হয়।

আজ আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য Fostering disability inclusive societies for advancing social progress. অর্থাৎ প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ি, সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করি। বিশ্বকে এই আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আহ্বান কি বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনের কোথাও প্রতিধ্বনিত হয়? নাকি শহরের যানজট, সরকারি দপ্তরের সিঁড়ি, হাসপাতালের দোতলা, ফুটপাতের ভাঙাচোরা ইট, আর গণপরিবহনের উঁচু সিঁড়িগুলো সব মিলিয়ে একটিই কথা জানান দেয়— এই পথ তোমার নয়। 
প্রতিবছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব মানে শুধু জন্মের অধিকার নয়, বরং সসম্মানে বেঁচে থাকা, চলাফেরা করা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অংশ নেওয়া, এবং সমাজের মূলধারায় নিজের অবস্থান তৈরি করার স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলাদেশে দশ থেকে পনেরো শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করলেও, তাদের অধিকার ও প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সচেতনতা এখনো ভয়াবহভাবে অপর্যাপ্ত।

প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে বৈষম্য আমাদের চেতনায়, আচরণে এবং সর্বোপরি আমাদের রাষ্ট্রের অবকাঠামোতেই দৃশ্যমান। আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম সূচক হলো—কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক তার রাস্তাঘাট, ভবন, পরিবহন ও সেবা ব্যবস্থা। সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশ এখনো খুব নিচে অবস্থান করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। সেই হিসেবে বিশ্বের একশ কোটিরও অধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৯ শতাংশ। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে  বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পুরুষের সংখ্যা ৯ লাখ ৮১ হাজার ৭৪১ জন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীর সংখ্যা ৬ লাখ ২৬ হাজার ৫৩৯ জন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ। এতো বড় একটি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে প্রবেশাধিকার থাকবে না; এটা স্বাভাবিক ঘটনা কি? 

একটি দেশের সভ্যতার পরিচয় ঘটে তার রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে। বাংলাদেশ সেখানে চরমভাবে বিবর্ণ। রাজধানী ঢাকায় একবার হাঁটলেই বোঝা যায়, এই শহর এখনো ভিন্ন সক্ষমতার মানুষের কথা ভেবে গড়ে ওঠেনি। যে ফুটপাত মানুষকে বাঁচাতে বানানো হয়, সেই ফুটপাতই আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে প্রথমেই মৃত্যুভয়ের সামনে দাঁড় করায়। কারও পায়ের নিচে গর্ত, কারও সামনে সিঁড়ি, কোথাও দোকানপাট, কোথাও গাড়ি চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা—সব মিলিয়ে ফুটপাত এখানে মানুষের জন্য নয়; বরং শক্তিধর, সক্ষম ও দাপুটেদের জন্য।

একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে আপনি যদি ফুটপাতে তুলতে চান, প্রথমেই তাকে তুলতে হবে কার্বে একটি উঁচু, অনমনীয় বাধায়। প্রতিটি কার্ব, প্রতিটি সিঁড়ি, প্রতিটি অসমান ঢালু জায়গা যেন তাকে বলে, তুমি এই শহরের কেউ নও। এ শুধু ঢাকার নয়; চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী—সব শহরের একই চিত্র। আমাদের পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনায় এখনো প্রবেশাধিকার মানে সিঁড়ির পাশে ছোট্ট একটি র‌্যাম্প আঁকা। কিন্তু সেই র‌্যাম্প এত খাড়া হয় যে তাতে হুইলচেয়ার ওঠানো মানে যন্ত্রণা নয়—বিপদ। সেই র‍্যাম্পে সুস্থ মানুষের বাইকখানা তোলাই মুশকিল হয়ে পড়ে। 

হাসপাতাল এমন একটি জায়গা যেখানে কারো কাছে দয়া নয়, সেবা পাওয়াই মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশে অসুস্থ মানুষ হুইলচেয়ার বা ক্রাচে বা ব্রেইলে চলা মানুষটি হাসপাতালে পৌঁছে প্রথমেই দেখেন—প্রবেশদ্বার সিঁড়ি বাঁধানো। চিকিৎসার চেয়েও বড় শঙ্কা তখন হয়, আমি ভেতরে ঢুকব কীভাবে? এখানে আমার প্রবেশের স্বাধীনতা আছে তো?

একটি অগম্য ভবন কেবল প্রতিবন্ধী মানুষের বিরুদ্ধে নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকারের বিরুদ্ধে। একটি জটিল রাস্তা কেবল তার জীবনকে কঠিন করে না, এটি সরাসরি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। কারণ গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ভবনে, প্রতিটি সেবায় সব নাগরিক সমানভাবে অংশ নিতে পারে। একজন মানুষ ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারলে তার ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হয়। একজন মামলার বাদী আদালতে ঢুকতে না পারলে বিচার তার নাগালের বাইরে চলে যায়। একজন উদ্যোক্তা সরকারি দপ্তরে যেতে না পারলে তার ব্যবসা আটকে যায়। এগুলো শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রেরই ক্ষতি।

মেট্রোরেলে একটি ঘটনা বলি। সেখানে লিফট আছে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছে একজন  হুইল চেয়ার আরোহী। সুস্থ সক্ষম ব্যক্তিরা সকলেই উঠে গেলেন। এবং বলত বলতে গেলেন একটা হুইল চেয়ার অন্তত তিনজনের জায়গা আটকাবে। তাদের তাড়া আছে। পরের বার সে যেন ওঠে। পরের বারও হুড়ুমুড় করে উঠে গেল পদযুক্ত মানুষগণ। যেনো হুইল চেয়ারের দায়ে তার কোনো  ফেরার তাড়া নেই। সময়মতো পৌঁছেও তাকে দুবার ট্রেন মিস করতে হলো। 

২০১৩ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন পাস করেছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, অ্যাক্সেসিবিলিটি বা প্রবেশাধিকার একটি মৌলিক অধিকার। সরকারি-বেসরকারি সব ভবনে র‌্যাম্প, লিফট, প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগারের প্রবেশসুবিধা, ব্রেইল সাইন, অডিও-ভিজ্যুয়াল নির্দেশনা—সব থাকতে হবে। কিন্তু আইন যেন কেবল কাগজে-কলমে, নথিতেই জন্ম নেয়ার জন্য, বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। নতুন নির্মিত ভবনেও র‌্যাম্পের নাম করে সামান্য ঢালু সিঁড়ি বানানো হয়, যা হুইল চেয়ার নয়, চড়াইপথে অভ্যস্ত মানুষের চলাচলের উপযোগীও নয় যেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মনে করে, অ্যাক্সেসিবিলিটি মানে বাড়তি খরচ। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিটি অ্যাক্সেসিবল ভবন দীর্ঘমেয়াদে বেশি লাভজনক। কারণ তা সর্বজনীনভাবে ব্যবহৃত হয়।

সরকারি তদারকি বিভাগগুলোও প্রায়ই ভবন পরিদর্শন করে; কিন্তু প্রবেশাধিকারের দিকটি অনেক সময়ই গৌণ হিসেবে ধরা হয়। বলা হয়, পরে ঠিক করা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরে কখন? কারা করবে? মজার বিষয় হলো, একজন মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মান না, আবার জন্মানও। জীবনের যে কোনো সময় দুর্ঘটনা, রোগ, বয়স, যুদ্ধ, জলবায়ু দুর্যোগ—সব কিছু মিলিয়ে যে কেউ যে কোনো দিন প্রতিবন্ধিতা অর্জন করতে পারেন। তাহলে প্রবেশাধিকার কেবল ‘অন্যের’ বিষয় নয়, এটা আমাদের সবার ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

আমরা হয়তো আজ সক্ষম; কিন্তু বয়স বাড়লে সবাই কখনো না কখনো শারীরিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হবো। জন্মগত বা দুর্ঘটনা, অসুস্থতা—জীবনের যে কোনো পর্যায়েই কেউ একজন ভিন্ন সক্ষমতার হয়ে যেতেই পারেন। অথচ অ্যাক্সেসিবিলিটি সবার জন্য: শিশুর জন্য সুবিধাজনক পথ, গর্ভবতী নারীর নিরাপদ চলাচল, বয়স্ক মানুষের আরাম, রোগীর সুরক্ষা, সবার স্বাভাবিক গতিশীলতা।

অ্যাক্সেসিবিলিটি মানে ভবন, সেবা ও প্রযুক্তিকে এমনভাবে নির্মাণ করা যাতে সেটি সকলের জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়। এটি উন্নয়ন ব্যয় নয়, এটি উন্নয়নের ন্যূনতম শর্ত। বিশ্বের যেসব দেশ সত্যিকার অর্থে সমতা চায়, তারা জানে, প্রবেশাধিকার শুধু প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয় নয়; এটি সকল মানুষের নিরাপত্তা, সম্মান ও উন্নয়নের অংশ। র‌্যাম্প শুধু হুইল চেয়ারের জন্য নয়, শিশু কোলে নেওয়া মা, বয়স্ক মানুষ, আহত ব্যক্তি—সবাই সেই র‌্যাম্প ব্যবহার করে। লিফট শুধু ভিন্ন সক্ষমতার মানুষের জন্য নয়, এটি সভ্যতারও চিহ্ন।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু কোনো দেশ উন্নত হয় তখনই, যখন তার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও নিজেকে নিরাপদ ও স্বাগত মনে করে। কখনো কখনো জনগণের মনোভাব সরকারি ব্যর্থতার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষকে এখনো করুণার চোখে দেখা হয়। তাকে সক্ষম, প্রতিভাবান, কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে না দেখে, বেশিরভাগ সময় তাকে ‘সহানুভূতির বা করুণার পাত্র’ বানিয়ে ফেলা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙ্গে দেয় তার মনোবল। তার আত্মবিশ্বাসটুকু নষ্ট করে দেয়। তাকে হীনমন্য করে তোলে যেন তারই কোনো সহকর্মী বা প্রতিবেশী।

দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা জানেন না কীভাবে ভিন্ন সক্ষমতার ছাত্রকে ক্লাসে অন্তর্ভুক্ত করবেন। অফিসে অনেকে মনে করেন, হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী মানে কম সক্ষম কর্মী। গণপরিবহনে উঠতে গেলে তাকে প্রায়ই বলা হয়, এটা আপনার জন্য না। সিট নাই, পরের বাসে আসেন। 

এই মনোভাবই মূলত সাম্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ অবকাঠামো গড়া সহজ; কিন্তু মন গড়া কঠিন, দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা আরো কঠিন। আর রাষ্ট্র যদি সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি গড়তে না পারে, তাহলে র‌্যাম্প, লিফট, সাইন—সবই কাগজের উন্নয়ন হয়ে থাকে, জীবনের নয়।

বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটির মতো মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাস করছেন—দৃষ্টিহীনতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা, শারীরিক চলাচলগত প্রতিবন্ধকতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ, স্নায়বিক পার্থক্যসহ নানা পরিস্থিতি। অর্থাৎ আমরা এই দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে পথ চলার অধিকার দিচ্ছি না। রাষ্ট্রের চোখে তারা নাগরিক, কিন্তু নাগরিকত্বের দরজাটা তাদের জন্য খোলা নয়। বাংলাদেশ চাইলে এখনই পরিবর্তন শুরু করতে পারে। বিশ্বজুড়ে যে নীতিগুলো কার্যকর সেগুলো আমরা খুব সহজেই অনুসরণ করতে পারি:

এ জন্য নতুন ভবন অনুমোদন পাওয়ার আগে অ্যাক্সেসিবিলিটি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার নিরীক্ষা করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রবেশাধিকার মূল্যায়ন টিম গঠন করা যেতে পারে। লো-ফ্লোর বাস, র‌্যাম্পযুক্ত ট্রেন কোচ, স্টেশন প্ল্যাটফর্মের সমতল নকশা—এসব জরুরি।

সরকারি ওয়েবসাইট, ব্যাংকিং অ্যাপ, শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম—সবই স্ক্রিন রিডার, অডিও-ভিজ্যুয়াল গাইড ইত্যাদিতে উপযোগী করতে হবে। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন সক্ষমতাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে সমাজ বদলাবে দ্রুত।

উন্নয়নের দিকে ধাবিত আমাদের বাংলাদেশ।  কিন্তু এই পরিবর্তন তখনই অর্থপূর্ণ হবে, যখন রাস্তায় নামা একটি হুইল চেয়ার, হাঁটার লাঠি, সাদা ছড়ি বা ব্রেইল বই সমাজকে সংকুচিত করবে না, বরং সমৃদ্ধ করবে। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে কোনো সমস্যা নেই; সমস্যাটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবকাঠামোয়। সমাজের এই খাড়া করে রাখা মনোদেয়াল ভাঙ্গতে হবে।

জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য তাই শুধু স্লোগান নয়, একটি সতর্ক সংকেত। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থেই সামাজিক অগ্রগতি চায় তাহলে প্রথম কাজটি হলো প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অফিস, প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সবার জন্য প্রবেশাধিকারের সমতা তৈরি করা। কারণ সমতা মানে দয়া নয়। সমতা মানে সকলের জন্য সমান দরজা। শুধু র‌্যাম্প নয়, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে।

শুধু আইন নয়, প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু স্লোগান নয়, প্রতিটি নাগরিকের জীবনে তা দৃশ্যমান করতে হবে। তবেই আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশ সত্যিই disability inclusive society গড়ার পথে হাঁটছে। তবেই অগ্রগতি হবে সবার। তবেই রাষ্ট্র হবে মানুষের জন্য, সকল মানুষের জন্য।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক 
 

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত নিবন্ধ

  • অধরা খান ‘ঋতুকামিনী’র অপেক্ষায়!
  • মাগুরায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে ভূমি ও রেজিস্ট্রি অফিসে আগুন
  • রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিশেষ অভিযানে ১৪ জন গ্রেপ্তার
  • দোকানে ঢুকে র‍্যাকুনের কাণ্ড
  • কোনো স্কুলে তালা ভেঙে, কোথাও পুলিশ পাহারায় পরীক্ষা
  • দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, সড়কে ছিটকে পড়তেই বাসচাপায় প্রাণ গেল দুজনের
  • বার্ষিক পরীক্ষায় স্কুলে ‘শাটডাউন’: আলোচনা করে পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি বাড়বে
  • হাসলে কি অজু ভেঙে যায়
  • সৌদি আরবে শান্তি আলোচনায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান
  • অবকাঠামো বৈষম্য ও প্রবেশাধিকার সমতা